রবিবার , ১১ জানুয়ারী ২০২৬
studentnewsbd
৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১:০৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?

পরিকল্পনা তৈরি

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গেলে চাই সঠিক পরিকল্পনা। এই অধ্যায় আপনাকে সেই পরিকল্পনার বিভিন্ন ধাপ বা পর্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। অনুসন্ধান শুরুর আগে নিজেকে কোন কোন প্রশ্ন করতে হবে, সূত্র যাচাই করবেন কীভাবে, বার্তাকক্ষের কাছে নিজের স্টোরিকে প্রস্তাব করার পদ্ধতি এবং প্রতিবেদনটি করতে যত টাকা খরচ হবে তার বাজেট তৈরির উপায় কী – এমন একেকটি উদাহরণের মাধ্যমে এই অধ্যায় আপনাকে জানিয়ে দেবে, অনুসন্ধানের জন্য পরিকল্পনা কতটা জরুরী। আরো জানা যাবে, নির্ভরযোগ্য সোর্স কীভাবে চিনবেন এবং প্রমাণ-নির্ভর রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে আপনার গল্পের বর্ণনাকে কীভাবে আকর্ষণীয় করে তুলবেন।

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?


আপনি একটি আইডিয়া বা ধারণা পেলেন, আর সাথে সাথেই অনুসন্ধানে নেমে পড়লেন, বিষয়টি এমন নয়। আইডিয়া বা ধারণা শুরু করার একটা জায়গা মাত্র। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে আছে গভীর সামাজিক দায়; আছে নানা ধরণের আইনি ঝুঁকি। একারণে আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে প্রতিবেদনটিকে যেন যথাসম্ভব সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়। গণমাধ্যমে কাজ হয় দলীয় প্রচেষ্টায়, সম্পদও লাগে বেশি। তাই মাঠে নামার আগেই সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ এবং অনুসন্ধানের জন্য আপনার যে ধরণের উপকরণ লাগবে তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আর গল্পের প্রতিটি ধাপ কিভাবে এগোবে, তা আগেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।

অনুসন্ধানের ধারণা কোন উৎস থেকে এসেছে, সেটি আপনার কর্মপরিকল্পনা সাজানোর একটি নিয়ামক। সেই ধারণা যদি আপনার নিজের পর্যবেক্ষণ বা একটিমাত্র ঘটনা থেকে আসে, তাহলে আগে নিশ্চিত হতে হবে, এই অভিজ্ঞতা কি নিছক ব্যক্তিপর্যায়ের, নাকি তা বৃহত্তর কোনও প্রবণতা বা ইস্যুকে তুলে ধরে। যদি এই ধারণা কোনো গোপন সূত্র থেকে আসে তাহলে আপনাকে তার যথার্থতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তথ্যদাতার অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এগুলো সবই করতে হবে কাজ শুরুর আগে। যদি আপনার সূত্র নিখুঁত হয় এবং প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ যদি অকাট্য হয়; তারপরও এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে আপনার আইডিয়াকে একটি শক্ত অনুমান বা হাইপোথিসিসের ওপর দাঁড় করাতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আপনার অনুসন্ধান যার উত্তর খুঁজবে, অথবা যাকে সত্য বা মিথ্য বলে প্রমাণ করবে, সেই প্রশ্নটি আগে ঠিক করে নিতে হবে। অবশ্য প্রাথমিক পর্যায়ের এই পরিকল্পনা যে একেবারে অপরবর্তনীয়, তা নয়। এতে পর্যাপ্ত নমনীয়তা থাকতে হবে যাতে আপনার অনুসন্ধানে নতুন তথ্য বা দিক পাওয়া গেলে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়।

প্রায়ই দেখা যায়, অনুসন্ধান শুরু হয় বিস্তৃত একটি ধারণা নিয়ে, ফলে বড় পরিসরে তার সাথে জড়িত মোটামুটি সব বিষয় খতিয়ে দেখার (এবং সম্ভবত অনিয়ন্ত্রণযোগ্য) পরিস্থিতি তৈরি হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা আটলান্টা জার্নাল-কনস্টিটিউশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং স্বনামধন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদক টমাস অলিভার বলেছেন: “অনেক সময় একটি বিষয়ে আপনি যা যা জানতে চান, তার সম্ভাব্য সবকিছু অনুসন্ধানী প্রকল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলার ঝোঁক দেখা যায়। এটা একটা দুর্বলতা, শক্তি নয়।”

আপনার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়া ও উন্নত করার একটা ভালো কৌশল হলো বিষয়টি নিয়ে লিখতে শুরু করা। প্রতিবেদনের একটি সারসংক্ষেপ তৈরির চেষ্টা করুন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন কেমন হবে তা নিয়ে একটি প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলুন। এভাবে বার্তাকক্ষকে আপনার প্রতিবেদন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়া যাবে এবং সম্ভাব্য সব ব্যাখ্যাও দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমেই আপনি বুঝতে পারবেন – প্রতিবেদনটি স্থানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দাঁড় করাবেন, নাকি তার আঞ্চলিক বা জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলার মত ক্ষমতা আছে। এই পর্যায়ে নীচের প্রশ্নগুলো আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে:

  • > কী ঘটছে? কেন আপনার পাঠক বিষয়টিতে আগ্রহী হবে?
  • > এর সঙ্গে কারা জড়িত? কীভাবে তারা এটা করেছে? এর ফল কী হয়েছে?
  • > কী ভুল/অনিয়ম হয়েছে? কীভাবে এই ভুল/অনিয়ম হয়েছে? এর পরিণতি কী?
  • > খবরটি প্রকাশ হলে কারা সুবিধা পাবেন এবং কারা সমস্যায় পড়বেন? খবরটি প্রকাশ পেলে সমাজের আচরণ বা মূল্যবোধ নিয়ে কি কোনো বিতর্ক হবে? বিশেষ এই খবরটিতে কি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার ত্রুটির বিষয়টি উঠে আসবে?

কীভাবে প্রতিবেদন লিখবেন তা ভাবতে এবং কীভাবে অনুসন্ধান করবেন তার পথ শনাক্ত করতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনাকে সাহায্য করবে।


উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পানি সরবরাহ সেবা বেসরকারিকরণ করার পর কোনও এলাকায় ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে, এমন একটি প্রতিবেদনের কথা। আপনি রিপোর্ট করতে পারেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে না পেরে, মানুষ কীভাবে কোথা থেকে পানি সংগ্রহ করছে (এখানে প্রধান কথা হলো ক্রয়ক্ষমতা)। কিংবা আপনি শোধনাগার পরিদর্শন করে পানি নিরাপদ করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন করতে পারেন (এখানে প্রধান কথা হলো খরচ কমাতে গিয়ে মাননিয়ন্ত্রণে ঘাটতি)। সতর্কভাবে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে প্রতিবেদনের মূল বার্তা চিহ্নিত করা সহজ হয়।

এই সময়ে আপনি আরো দেখবেন: প্রতিবেদনটি সত্যিই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিনা এবং বিভ্রান্তিকর হতে পারে এমন যে কোেেনা ধারণা বাদ দিতে হবে। দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে কেউ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। আপনি যখন আপনার প্রয়োজনীয় সব তথ্য-প্রমাণ পেয়ে যাবেন, তখন এই প্রশ্নগুলোতে ফিরে গিয়ে, আপনি আপনার লেখাকে সাজাতে পারবেন।

ধারণা থেকে অনুমান


এবার আপনাকে এই প্রাথমিক ভাবনাগুলো থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের দিকে যেতে হবে, যেগুলোর উত্তর আপনার প্রতিবেদনে থাকবে। এটি আপনাকে সাহায্য করবে:

  • ! প্রতিবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রমাণগুলো কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে।
  • ! উদ্দেশ্য ও সীমানা নির্ধারণ করে দিয়ে আপনার কাজটাকে আরো সহজ করতে।
  • ! প্রতিবেদনের এই ধারণা অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে ও তুলে ধরতে।
  • ! প্রতিবেদনের জন্য দরকারি সময়, সরঞ্জাম ও সম্পদ (খরচ) এর বাজেট তৈরিতে।
  • ! চূড়ান্ত প্রতিবেদন লেখার ভিত্তি ও গাঁথুনি নির্ধারণে।

একটি ধারণা থেকে একাধিক অনুমান দাঁড় করানো যায়, বা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকনির্দেশনা তৈরি করা যায়। যেমন: আপনার ধারণা হলো পানি সরবরাহ সেবা বেসরকারিকরণের পর দরিদ্রদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। এখান থেকে দুটি অনুমান করতে পারেন:

(ক) পানি সরবরাহব্যবস্থা বেসরকারিকরণের ফলে দাম বেড়ে যাওয়ায় গরিবরা তা কিনতে পারে না; তাই তারা বিনে পয়সায় অস্বাস্থ্যকর উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে, যার পরিণতি হচ্ছে মহামারী।

(খ) বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি খরচ কমাতে পানি বিশ্ুদ্ধকরণ ও সরবরাহে মাননিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়ায় পানির বিশুদ্ধতা কমে যাচ্ছে, যে কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু আপনাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে – এই অনুমানের ভিত্তি কী, এবং তা কতটা ন্যায্য? দুই ক্ষেত্রেই রোগের উৎস বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে। অনুমান ‘ক’-তে বিনে পয়সার অন্যান্য উৎস থেকে সংগৃহীত পানিকে দায়ী করা হয়েছে; এবং অনুমান ‘খ’-তে পানির প্লান্টগুলো বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার ব্যাপারে উদাসীনতাকেই দায়ী বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য এই দুই অনুমান-ই আপনাকে খতিয়ে দেখতে হবে, কারণ এই দুটোরই ভিত্তি অনেক গভীরে – রোগের শুরু কোত্থেকে?

আরও ভালো অনুমান হতে পারে:

(গ) সম্প্রতি ‘এক্স’ পৌর এলাকায় পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী – হয় বেসরকারি পানি সরবরাহকারীরা কিংবা বিনে পয়সার উৎস থেকে পাওয়া পানি।

এই পরিমার্জিত উপসংহার আপনাকে প্রতিবেদনের রুপরেখায় নিয়ে যাবে এবং সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অনুসন্ধানের পথ দেখাবে।

(ঘ) ‘এক্স’ পৌর এলাকায় সম্প্রতি একটি পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে পানি সরবরাহব্যবস্থা বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে খোঁজা হবে মহামারী কীভাবে শুরু হলো। এর কারণে কি বেসরকারি কোম্পানির পানির দাম মানুষের সামর্থ্যের বাইরে বলে তারা বিনে পয়সায় কূপ বা উন্মুক্ত জলাশয় থেকে দূষিত পানি সংগ্রহ করছে? নাকি, খরচ কমাতে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি পানি বিশুদ্ধকরণের মান কমিয়ে দিয়েছে – এই কারণে? আমরা এই মহামারির উৎস জানতে বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলব। অভাবী মানুষগুলো বিনে পয়সার পানির জন্য প্রতিদিন কোন উৎসগুলোতে যায় তা অনুসন্ধান করব। এবং স্বাধীন বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞকে নিয়ে পরিশোধনকেন্দ্রের নিরাপত্তার মান যাচাই করব। এভাবে যখন এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কারণ শনাক্ত করা যাবে, তখন তা ঠেকাতে কী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তাও খতিয়ে দেখা যাবে।

প্রতিবেদনের জন্য আপনি যখন সুস্পষ্টভাবে একটি ব্যাখ্যা বা অনুমান দাঁড় করাতে পারবেন তখন আপনার এই বিষয়গুলোসহ গবেষণার পরিকল্পনা করতে হবে:

  • > তথ্যের জন্য সূত্র বের করা,
  • > কী ধরণের প্রমাণ প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা,
  • > কোন পদ্ধতিতে কাজ করবেন তা নির্ধারণ,
  • > টাইমলাইন তৈরি এবং
  • > বাজেট প্রণয়ন

এই ধাপগুলোর পরিকল্পনা কীভাবে হবে তার একটা সাধারণ ধারণা এই অধ্যায়ের পরবর্তী অংশে তুলে ধরা হয়েছে। আর, পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে তুলে ধরা হবে, এই ধাপগুলো কার্যকর করার বিস্তারিত বর্ণনা।

এবং শেষপর্যায়ে, প্রতিবেদনটি সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেওয়ার জন্য আপনাকে দিতে হবে একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম। শেষপর্যন্ত হয়তো এই শিরোনাম আপনি বদলেও দিতে পারেন। কিন্তু শুরুতে একটি শিরোনাম সামনে রেখে কাজ করলে সেটি আপনার প্রতিবেদনে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করবে। এতেকরে আপনার জন্য প্রতিবেদনটি পিচ বা প্রস্তাব করা যেমন সহজ হবে, তেমনি গল্পটি সৃজনশীলতার সাথে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়, সেই চিন্তাতেও সাহায্য করবে। অবশ্যই যখন প্রয়োজন পড়বে, তখন আপনি এটি এদিক-সেদিক করে নিতে পারবেন।

সূত্র


সোর্স ম্যাপিং: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে, আপনার প্রতিবেদনের প্রধান চরিত্রগুলোকে সনাক্ত করা এবং তাদের কর্মকা- নথিবদ্ধ করা। অনেক প্রকাশ্য রেকর্ডেই সরকার, হাসপাতালের কর্মী, করপোরেশন, মাফিয়া চক্র বা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। আপনার অনুমান সঠিক কিনা তা যাচাইয়ে অনেক সূত্রই আপনার সহায়ক হতে পারে এবং সেগুলো আপনার অনুমানের সত্য-মিথ্যা নিশ্চিত করতে পারে। প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য যাচাইয়ের জন্য অবশ্যই দুই-সূত্র নীতি অবলম্বন করবেন। তার মানে আপনি একই তথ্য দুটি নিরপেক্ষ সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছেন। এই সূত্রগুলো আপনাকে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপার্ট’ বা পটভূমির বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ যোগাবে। আপনার নোটবুকে সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত ঠিকানা টুকে রাখতে ভুলবেন না।

সূত্র বা সোর্স মূলত দুই ধরণের: প্রাথমিক বা সেকেন্ডারি।

প্রাথমিক সোর্স: এরা আপনাকে একদম প্রত্যক্ষ তথ্যপ্রমাণ দেবে বা সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলবে। যেমন, কোনো রোগী যদি কোনো নার্সের মাধ্যমে হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ কেনেন, তাহলে সে ওষুধের কালোবাজার সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। অবশ্য নার্সরা দৃশ্যের আড়ালে কী কী কর্মকা- করে, সে ব্যাপারে হয়তো আপনাকে বিস্তারিত বলবে না। কোনো পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্টের জমাদার – যাকে হয়তো প্রতি সপ্তাহের বদলে মাসে একবার পানির বিশুদ্ধতা যাচাই করতে বলা হয়েছে – তিনিও হতে পারেন আপনার প্রাইমারি সোর্স। কোনো মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাব বিবরণীও একটি প্রাইমারি সোর্স। সেখানে হয়তো আন্তর্জাতিক কোনো আগ্নেয়াস্ত্র কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার কথা লেখা আছে। সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করে নিতে পারলে এসব প্রাইমারি সোর্স থেকেই আপনি পাবেন সবচে কার্যকর প্রমাণ। তবে এসব খুঁজে পাওয়া প্রায়ই খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কোনো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত- এমন অনেকেই হয়তো ভবিষ্যতের হয়রানি বা ঝামেলার কথা ভেবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না। অন্যদিকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা হাসপাতালের নথিপত্রের মতো বিষয়গুলো গোপন রাখা হয়, অথবা গেপানীয়তা আইনের কারণে সহজে পাওয়া যায় না।

সেকেন্ডারি সোর্স: এই ক্যাটাগরির মধ্যে থাকবে সব ধরনের নথি: যেমন, সংগঠনের নানারকম রিপোর্ট; বা এমন কোনো ব্যক্তি যিনি ঘটনা নিজে দেখেননি কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শোনা বিবরণ আপনাকে বলছেন (‘আমার এক বন্ধু, যে… ’)। সেকেন্ডারি সোর্সও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো জানাবোঝার জন্য। এখান থেকে আপনি অন্য কোনো সূত্রও পেয়ে যেতে পারেন। তবে সেকেন্ডারি সোর্স থেকে পাওয়া যে কোনো তথ্য খুব ভালোমতো যাচাই করে নিতে হয়।

সোর্সকে আপনি আরো চারভাগে বিভক্ত করতে পারেন: ব্যক্তি, নথি, ডিজিটাল ও গণ (ক্রাউড-সোর্স)।

(ক) ব্যক্তি সূত্র: অনেক সূত্রই এই শ্রেণীতে পড়ে: যারা সরাসরি জড়িত, প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট; এ বিষয়ে আগ্রহী ও অনিচ্ছুক। আপনি যার কাছে তথ্যের জন্য যাবেন, তার অবস্থান, বিশ্বাসযোগ্যতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। আপনি যদি পানি সরবরাহ বেসরকারিকরণ নিয়ে প্রতিবেদন করেন তাহলে বেসরকারিকরণের বিরোধিতাকারী সংগঠন, সংস্থা বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা আপনাকে বিরোধিতার কারণ নিয়ে প্রচুর তথ্য ও জোরোলো যুক্তি বা মতামত দিতে পারবেন। কিন্তু এই তথ্য আসছে নির্দিষ্ট অবস্থানের ব্যক্তিদের কাছ থেকে, সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে, যাঁরা একটি বড় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। সে ক্ষেত্রে যিনি বা যাঁরা সারাংশ হিসেবে তথ্য সরবরাহ করতে পারেন তিনি বা তাঁরা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই গোষ্ঠীর মতামত পরিবর্তন করে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পয়েন্ট বাদ দিয়ে তা আপনার কাছে তুলে ধরতে পারেন। তাই আপনাকে বিস্তৃতভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও সূত্র থেকে তথ্য নিতে হবে। আপনি কোনো জনগোষ্ঠীর মতামত নিতে গেলে আপনাকে বিবেচনা করতে হবে তা যেন পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন: নারী, পুরুষ, তরুণ, বৃদ্ধ, উচ্চ ও নিম্নআয়ের কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার ভিন্নতার দিকগুলোও বিবেচনায় নেওয়া। ব্যক্তি সূত্র আপনার প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে এবং খবরকে জীবন্ত করে তোলে।

(খ) নথি সূত্র: এই সূত্র হতে পারে বই, সংবাদপত্র এবং সাময়িকী, সরকারি দলিল এবং ব্যবসায়িক দলিল, যেমন: চুক্তিপত্র বা ব্যাংক বিবরণী। এটা হতে পারে এমন তথ্য যা গবেষণায় বেরিয়ে আসলেও (‘গ্রে বিষয়বস্তু’) রিপোর্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়নি (যেমন: বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত গবেষণা, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট গবেষণা), অথবা যা সরকারীভাবে বা আনুষ্ঠানিকভাবে গোপন রাখা হয়েছে। তবে নথিপত্র খোঁজার (পেপার ট্রেইল) কিছু চ্যালেঞ্জও আছে: কখনো কখনো আমরা জানতেই পারি না যে প্রমাণ সত্যি আছে নাকি নেই। নথি থাকলেও সেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে দুর্বল নথি ব্যবস্থাপনার কারণে; কোথাও কোথাও তথ্য অধিকার আইন নেই বলে আবেদন করেও সেটি পাওয়ার সুযোগ থাকে না; আবার তথ্যটি প্রকাশিত হলে প্রতিষ্ঠান বা সরকার সমস্যায় পড়বে ভেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নথি পাওয়ার পথে বাধাও সৃষ্টি করতে পারেন। তাই আপনি যে বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন সে বিষয়ে কোথায় কী নথি থাকতে পারে, সেসব নথি কোথায় কীভাবে রাখা হয়েছে এবং কীভাবে এই নথিগুলো পাওয়া যেতে পাওে – এগুলো খুঁজে বের করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় প্রাথমিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নথি পাওয়ার জন্য যদি কোনো কর্মকর্তার আগাম অনুমতি প্রয়োজন হয়, তাহলে গবেষণা শুরুর পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব এই আবেদন করতে হবে। কারণ কর্মকর্তার অনুমতির পরও নথি পেতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে।

(গ) ডিজিটাল সূত্র: ডিজিটাল সূত্র হলো যে তথ্যগুলো ওয়েবে এবং ডিজিটালি সংরক্ষিত রেকর্ডস থেকে পাওয়া যায়। অনলাইনে যে বিপুল পরিমাণে তথ্য পাওয়া যায় তা বিস্ময়কর। তবে অন্য সূত্রের মতোই এসব সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। আপনাকে যাচাই করে নিতে হবে তারা নিজেদের বিষয়ে কী লিখেছে এবং পরিবার ও বন্ধুরা তাদের কীভাবে তুলে ধরছে। মনে রাখতে হবে যে, ওয়েব প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। যে কেউ যে কোনো বিষয় ওয়েবের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করতে পারে, যার মধ্যে পুরোপুরি বিকৃত তথ্যও থাকতে পারে। এ ছাড়া অনলাইনে একই তথ্য অনেকদিন ধরে একই অবস্থায় থাকতে পারে, কিন্তু দেখা গেছে কিছুদিন পর সে তথ্যগুলো তামাদি হয়ে যায়। প্রথমে আপনাকে অবশ্যই সবচেয়ে হালানাগাদ তথ্য খুঁজতে হবে। আরও সাহায্যের জন্য আপনি ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টারের (ইজেসি) ভেরিফিকেশন হ্যান্ডবুকের কপি বিনামূল্যে ডাউনলোড করে নিতে পারেন। এতে কিছু টুলস রয়েছে যা আপনাকে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের পদক্ষেপগুলো র্বিস্তারিতভাবে নির্দেশ করবে।

(ঘ) গণ সূত্র: ক্রাউড সোর্স নামে বহুল পরিচিত নতুন এই টুল ব্যক্তি ও ডিজিটাল সূত্রের মিশেল ঘটায়। এতে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পাঠক-দর্শককেও অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। যেমন, টুইটারে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা বা কোনো ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা।

সূত্রের নেটওয়ার্ক তৈরি


প্রতিবেদনের কাজে আপনাকে অনেক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এতো কিছুর কথা একসঙ্গে মাথায় রাখার বিষয়টি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠতে পারে। ফলে সূত্রদের একটি ম্যাপের মাধ্যমে আঁকা যেতে পারে এবং ভিন্ন ভিন্ন রঙের তীরচিহ্ন ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝানো যেতে পারে। যদি সন্দেহজনক কিছু নজরে আসে; যেমন, কোনো টিম্বার লগিং ফার্মের প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বন উজাড় করার পক্ষের কোনো রাজনীতিবিদের। এই সম্পর্কটি পরবর্তীতে আরো ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে, তা মাথায় রাখুন। এটি হয়তো ক্লান্তিকর একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু আপনার মনোযোগ ধরে রাখুন আর নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন যে, আপনি সমাজের ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন এবং কণ্ঠহীনদের কথা তুলে আনছেন।

মার্ক হান্টার ও লুক সেঙ্গারস কার্যকরভাবে তথ্য মানচিত্র (ডেটা ম্যাপিং) তৈরির এবং তথ্য গুছিয়ে রাখার কিছু কৌশল তুলে ধরেছেন। সেগুলো হচ্ছে:

  • > একটি সময়পঞ্জি বা টাইমলাইন তৈরি করুন, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা থাকবে। যেমন: তারিখ, স্থান, সেখানে কে বা কারা ছিলেন, তিনি বা তাঁরা কী বলছেন, কী ঘটেছে। এগুলো এমনভাবে গুছিয়ে রাখুন, যাতে যখনই প্রয়োজন তখনই ব্যবহার করতে পারেন।
  • > তথ্য পাওয়ার সম্ভাব্য সূত্রগুলোর একটি তালিকা তৈরি করুন এবং (এবং এই তথ্যগুলো নিরাপদে সংরক্ষণ করুন) । কারো সঙ্গে যোগাযোগের পর তালিকাটি হালনাগাদ করুন এবং আরো কার কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, তা লিখে রাখুন
  • > প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগসূত্র একটি চিত্রের মত করে আঁকুন।
  • > গুরুত্বপূর্ণ নথির তালিকা তৈরি করুন। লিখে রাখুন আপনার কাছে কী আছে এবং আরও কী যোগাড় করতে হবে।
  • > নথিগুলোর সূচি তৈরি করুন। কম্পিউটারে কাজ করলে অনলাইন সংস্করণের জন্য হাইপারলিংক তৈরি করুন।
  • > যে তথ্যগুলোর বিষয়ে আপনি নিশ্চিত হয়েছেন সেগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত (হাইলাইট) করে রাখুন।
  • > অন্য তথ্যগুলো কী পর্যায়ে রয়েছে তা লিখে রাখুন।
  • > নিজের সঙ্গে নোটবুক রাখুন, যখন কিছু মনে হয় বা ভাবনা আসে তা লিখে ফেলুন।

পর্যাপ্ত প্রমাণ নিশ্চিত করা


যোগাযোগ করতে হবে, এমন সূত্রের তালিকা করে ফেলার পর আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, অনুমানকে প্রতিষ্ঠিত করতে কিংবা মূল প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেতে আপনি কোন কোন সাক্ষ্য-প্রমাণকে আমলে নেবেন। পানি শোধনাগারে আগে যতবার পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা হতো এখন তার চেয়ে কম করা হচ্ছে, শুধু সেটুকু প্রমাণ হলেই কি যথেষ্ট হবে, নাকি খুঁজে বের করতে হবে, গুণগত-মান পরীক্ষা কমে যাওয়ার পরিণতি কী হয়েছে? ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা শুধু নিজের অনুমানের সমর্থনে তথ্যপ্রমাণ যোগাড় করে না; বরং এর বিপরীতটাও খোঁজে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি আগে থেকেই ধনী, তিনি কোনো কাজ করে দেওয়ার জন্য ১০,০০০ ডলার ঘুষ নেবেন – এমনটি না হওয়ারই কথা। কাজেই চিন্তা করুন যে প্রমাণটি পেয়েছেন সেটি কি সোর্সের মনগড়া (তিনি মনে মনে ভাবছেন এমনই হওয়ার কথা, কিন্তু আসলে তা নয়)? আবারও বলছি, যে প্রমাণ পেয়েছেন তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করুন: এটি কতটা পূর্নাঙ্গ, এটি কোথা থেকে এসেছে, ভিন্ন ভিন্ন সূত্র কি এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবে।

এটি মাথায় রাখুন যে, কোনো কিছুর চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা বিরল। কখনো কখনো আপনি হয়তো শুধু এমন কিছু তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারবেন যেটি বলবে: অন্য কিছুর চেয়ে এমনটা ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। সব কিছুই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি হয়তো এই প্রতিবেদনটি করতে পারেন। যদিও এটি পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নয়। তবে কিছু বিষয় আপনি কিভাবে তুলে আনবেন, তা নিয়ে আপনাকে খুবই সতর্ক হতে হবে।

পদ্ধতি


সঠিক সূত্র বা নথি খুঁজে পাওয়াটা সব সময় এতো সাদামাটা হয় না।

মেথোডোলোজি বা পদ্ধতি শব্দটি শুনলেই মনে হতে পারে বিষয়টি একাডেমিক গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু এর অর্থ আসলে, আপনি কিভাবে আপনার অনুসন্ধান পরিচালনা করবেন তা নির্ধারণ করা। আপনি হয়তো এমন অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করবেন: নথিপত্র বিশ্লেষণ, সরাসরি সাক্ষাৎকার, স্থান পরিদর্শন। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন সূত্রগুলো ব্যবহার করবেন, প্রতিটির জন্য কতটা সময় ব্যয় করবেন, তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে (ক্রস চেক) কী প্রক্রিয়া অবলম্বন করবেন। এই কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের বাধা আসতে পারে, সে ব্যাপারে পরিকল্পনা করে নেওয়াও এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেমন প্রতিবেদনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি নাও পেতে পারেন কিংবা সূত্র হিসেবে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আপনার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নাও হতে পারেন। এ ব্যাপারে আপনার বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে? আপনি কীভাবে বিকল্প প্রমাণ যোগাড় করবেন, যা সমমূল্যের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে?

কাজের পদ্ধতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আপনাকে অনুসন্ধানের জন্য একটা সময়সূচি (টাইম লাইন) এবং বাজেট তৈরি করতে হবে। সময়সূচি হলো আপনার অনুসন্ধানে কতটা সময় লাগবে, তার একটি হিসেব: আর্কাইভ, সাক্ষাৎকার, গবেষণা, ওয়েবে অনুসন্ধান এবং প্রতিবেদন লেখায় আপনার কত ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হবে?

নানা কাজের মধ্যে আপনার সময় ব্যয়ের পাশাপাশি সময়সূচি তৈরির আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজ শেষ করার সময়সীমা (ডেডলাইন) এবং প্রতিযোগিতা। আপনার প্রতিবেদন যদি ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়ে থাকে তবে, জমা দেওয়ার সময়সীমা থেকে পিছন দিকে হিসাব করে কাজের সূচি ঠিক করুন। সাক্ষাৎকার-গবেষণার সূচি এই সময়কাঠামো মেনেই করতে হবে। অন্যদিকে, যদি প্রতিবেদনের প্রস্তাব আপনি কোনো সম্পাদকের কাছে অনুমোদনের জন্য দিয়ে থাকেন, তাহলে, কাজ শুরুর সময় উল্লেখ করুন এবং আপনার প্রতিবেদন কবে নাগাদ প্রস্তুত হবে তাও আপনাকে বলতে হবে। প্রতিবেদনের প্রস্তাব অনুমোদনের আলোচনাও এই প্রক্রিয়ার একটা অংশ। প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সম্পাদকের সঙ্গে আপনার আলোচনার জন্য এই সময়সূচির প্রয়োজন হবে।

তবে আপনার প্রতিবেদন যদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা বহুলআলোচিত কোনো বিষয়ে হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে অন্য মিডিয়াও কাজ করবে, এমনটাই স্বাভাবিক। এর ফলে প্রতিবেদনটি দ্রুত প্রকাশের একটি বাড়তি তাগিদ তৈরি হয়। তবে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাড়াহুড়া বা কোনো কিছু এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না, নইলে এর ফলে আইনি ঝামেলাও হতে পারে। আপনার সামনে একটি সময়সূচি থাকলে, আপনি বুঝতে পারবেন কোন পর্যায়ে এসে আপনি স্পষ্ট ও যথার্থ কিছু প্রকাশ করতে পারেন। এমনকি অনুসন্ধান পুরোপুরি শেষ না হলেও।

বাজেট


আপনার ‘প্রকল্প পরিকল্পনা’র জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজেট। এই অনুসন্ধান শেষ করতে কত টাকা লাগবে, কী ধরণের সরঞ্জাম দরকার হবে?

এই বিষয়গুলি বিবেচনায় নিতে হবে:

  • >   ভ্রমণ ব্যয় — বিমান ভাড়া, গাড়ী খরচ, নিজের এবং সোর্সের থাকা-খাওয়া
  • >   পরামর্শক ফি — যেমন অনুবাদ-নকলনবিশদের সম্মানী
  • >   যোগাযোগ খরচ — যেমন, ফোন ও ইন্টারনেট বিল
  • >   আর্কাইভ বা রেকর্ড খোঁজার ফি, বিভিন্ন নথির নোটারি করা ইত্যাদি

যদি দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, সদস্যদের জন্য কর্মশালা এবং মাঠপর্যায়ে ভ্রমণের খরচও বাজেটে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

পুরো বিশ্বজুড়েই নিউজরুমগুলো সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির পত্রিকাগুলোতে একেকটি অনুসন্ধানী প্রকল্পে যে পরিমাণ বাজেট থাকে, তা দিয়ে উন্নয়নশীল কোনো দেশের একটি ছোট সংবাদপত্র পুরো বছর চলতে পারে। আপনার প্রতিষ্ঠানের রিসোর্স যদি সীমিত হয়, তাহলে সহায়তা পাওয়া যাবে এমন উৎস খুঁজে বের করার ব্যাপারে সৃজনশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটা ভালো সূত্র হতে পারে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো। দেখা গেল আপনি যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছেন, ঘটনাচক্রে তা কোনো দাতা প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকারের সাথে মিলে যাচ্ছে। তবে দাতারা যাতে তাদের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে না পারে, সেই বিষয়ে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা হতে পারে গণ-অর্থায়ন (ক্রাউডফান্ডিং), এক কথায় পাঠক-দর্শকের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ। সাধারণ সাংবাদিকতার প্রকল্প বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য তহবিল সংগ্রহ বেশ জনপ্রিয়, আবার একই সঙ্গে কঠিনও।


ফেলোশিপ ও ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে দেখতে পারেন জিআইজেএন-এর রিসোর্স:


বেশিরভাগ সাংবাদিক-ই একমত – তথ্যের জন্য সূত্র বা সোর্সকে টাকা দেওয়া ভালো নয়। কেননা, টাকার লোভে সূত্র মিথ্যা তথ্য দিতে পারে বা ঘটনা অতিরঞ্জিত করতে পারে। এর চেয়ে খারাপ যা: টাকা দিয়ে হিতে-বিপরীত হয়ে উঠবে, যখন আপনার সোর্স পিছু হটবে বা পরে যখন সে তার বক্তব্যকে অস্বীকার করবে। এ ছাড়া টাকা দেওয়ার বিষয়টি আপনার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মান এবং সাংবাদিকের অনুসন্ধানী দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। তবে ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে, যেমন একজন সূত্র তার কাজের সময় বাদ দিয়ে আপনাকে সাক্ষাৎকার দিলে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, কিংবা যাতায়াতের খরচ বা অন্য ব্যয়ের জন্য টাকা দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে যে, কেন টাকা দেওয়া বা নেওয়া হচ্ছে। টাকাও দিতে হবে কম বা ‘স্বাভাবিক’ হারে। সূত্রকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে তিনি তথ্য দিয়ে আপনাকে কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ কোনো সুবিধা দিচ্ছেন না, বরং, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী বা সমাজকে সহায়তা করছেন।

কোথাও প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য কোনো কর্মকর্তাকে উৎকোচ দেওয়াটাও অমর্যাদাকর। কোনো কোনো সমাজে অবশ্য সাধারণ কিছু সুবিধা চাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে (যেমন, কোনো কিছু করার জন্য তারা চা বা ঠান্ডা পানীয় পানের খরচ) কিংবা সকালে অফিস খুলে তথ্য দিতে হবে, এসব কথা বলে কিছু সুবিধা তথা অর্থ দাবি করে। এ ধরনের পরিবেশে হয়তো আপনি তাদের কিছু না দিলে কাজই করতে পারবেন না। কিন্তু এই লেনদেনগুলোর কারণে হয়তো আপনার পুরো অনুসন্ধানই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। যত অল্প টাকাই হোক না কেন, এটিকে ঘুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। একসময় তারা তাদের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বা আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী গণমাধ্যমকে বলে দিতে পারে যে আপনি তাদের ঘুষ দিয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে আপনাকে বিশেষ কৌশল করতে হবে। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে পাঠককে যুক্তিযুক্তভাবে বোঝাতে হবে যে, কোন পরিস্থিতিতে পড়ে আপনি টাকা দিয়েছেন। শুধুই অর্থের ওপর ভিত্তি করে লেনদেনের সম্পর্ক বজায় রাখার চেয়ে সোর্সেও সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করাটা সবসময়ই ভালো পন্থা। এটি আপনি করতে পারেন আপনার কাজের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে।

প্রতিবেদন পিচ বা প্রস্তাব করা


আপনার প্রতিষ্ঠান যদি আপনাকে কোনো প্রতিবেদন করার দায়িত্ব দেয় (অ্যাসাইন করে), তাহলে যে পরিকল্পনার বিবরণ আমরা আলোচনা করেছি সেখান থেকে শুরু করুন। কিন্তু আপনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হলে, পরিকল্পনায় এমন যাবতীয় তথ্য থাকতে হবে, যাতে আপনার প্রস্তাব দেখে সম্পাদক রিপোর্টটিতে আগ্রহী হন। এখানে প্রস্তাবটি হচ্ছে, খবরের প্রতি সম্পাদকের সমর্থন আদায়ের জন্য একটি উপস্থাপনা। এতে নিচের বিষয়গুলো থাকা জরুরী:

  • > আকর্ষণীয় শিরোনাম
  • > প্রতিবেদনের পরিষ্কার রূপরেখা
  • > কেন প্রতিবেদন ওই প্রকাশনার পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
  • > কাজের পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ
  • > সময়সুচি বা টাইমলাইন
  • > বাজেট

কোনো কোনো মিডিয়া হাউস প্রতিবেদনটি তাদের পাঠকদের জন্য কীভাবে উপস্থাপন (লেখা, ছবি, গ্রাফিকস) করা উচিত সেবিষয়েও আপনার মতামত আশা করতে পারে; আবার, কেউ কেউ বিষয়টি তাদের নিজেদের সম্পাদক ও ডিজাইনারদের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন। এটাও মাথায় রাখবেন, আপনার প্রতিবেদনের প্রস্তাব তাদের পছন্দ নাও হতে পারে। এ কারণে প্রতিবেদন প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় বিস্তারিত অনুসন্ধান পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শুধু অত্যাশকীয় তথ্যগুলো তুলে করুন, বিশেষ তাৎপর্যপূণ তথ্যগুলো এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, যাতে আপনি অন্য কোনো বার্তাকক্ষের কাছেও প্রস্তাবটি নিয়ে যেতে পারেন।

অনুসন্ধান একা করবেন নাকি দল গড়বেন?


একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন একা একাই করে ফেলার অনেক কারণ পাওয়া যাবে:

  • > প্রতিবেদনের পরিসর আপনি একাই সামাল দেয়ার মত
  • > আপনার কাছে প্রায় সব রিসোর্স বা যোগাযোগ আছে
  • > সহকর্মীদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন।

তবে কোনো কোনো অনুসন্ধান প্রায়ই এমন অবস্থায় চলে যায় যেটি একজনের পক্ষে করে ফেলা কঠিন হয়ে ওঠে। আরো অনেকে তখন সেখানে হাত লাগালে কাজটির ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাকভাবে করা যায়। একই সঙ্গে একটি প্রতিবেদনের পেছনে অনেকের দৃষ্টি থাকলে নতুন নতুন অনেক আঙ্গিকও বেরিয়ে আসে

আপনি যদি একটা দল হিসেবে কোনো বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে আরও কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে এবং সেজন্য পরিকল্পনা করতে হবে। সবার আগে এবং সবচেয়ে জরুরী সিদ্ধান্ত হলো, প্রকল্প ব্যবস্থাপক কে হবেন। তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি দলের সব সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সমন্ব^য় করবেন। দ্বিতীয় ধাপ হলো, একটি কর্মশালা আয়োজন করা, যেখানে অনুসন্ধানের বিষয়ে সদস্যরা তাঁদের চিন্তাগুলো তুলে ধরতে পারেন এবং একটা স্পষ্ট করণীয় তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়।
আপনাকে এ বিষয়ে একটি কাঠামো ঠিক করে নিতে হবে:

  • ? দলের সদস্যরা কখন-কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?
  • ? সম্পাদনার প্রক্রিয়া কেমন হবে?
  • ? অনুসন্ধানের সময় বাধা এলে কিভাবে সামলানো হবে?
  • ? চূড়ান্ত স্টোরির ক্ষেত্রে কীভাবে দলের সবাই একমত হবেন?
  • ? কোর ধরনের খরচ বহন করা হবে?
  • ? অনুসন্ধানের প্রয়োজনে আড়িপাতা, ছদ্মবেশ ধারণ করা কিংবা কোনো নথি পেতে কাউকে টাকা দেওয়া যাবে কিনা?

এ ছাড়া, অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় দলের কোন সদস্যের কী ভূমিকা হবে তা সুস্পষ্ট করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। দলের কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থাকলে, তিনি বা তাঁরা অনুসন্ধানের বিষয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবেন। সংশ্লিষ্ট মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এবং অনুসন্ধান প্রকল্পের ব্যবস্থাপকের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকার বিষয়টি সুষ্পষ্ট করতে হবে। কখনো কখনো চুক্তিপত্র সইয়ের মাধ্যমে সেটি করতে হবে।

দলীয় সদস্যদের অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর সাথে পরিচিত হতে হবে: দলের সদস্যরা কি অনুসন্ধানের আগাগোড়া সব কিছু জানেন? সাধারণ নাগরিক হিসেবে দলের সদস্যরা কেন এই বিষয় নিয়ে আগ্রহী হবেন? অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উত্তম-চর্চা ও মূল্যবোধও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।

প্রকল্প ব্যবস্থাপকই কার্যত অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেন। তাঁকেই পুরো দলের লক্ষ্য ক্রমাগত সামনে নিয়ে আসতে হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর ব্যাপারে সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে এও নিশ্চিত করতে হয় যে, শেষপর্যন্ত তাদের প্রতিবেদনটি স্থানীয় কোনো ইস্যুতে জনগণের বোঝাপড়া তৈরিতে সাহায্য করবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক একই সঙ্গে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি এবং অনুসন্ধানী দলের সদস্যদের মধ্যে সংযোগ-সেতু হিসেবে কাজ করেন।

সময় ব্যবস্থাপনা করবেন কীভাবে


সাংবাদিকতার ধরনটাই এমন যে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট ডেডলাইন থাকবে। একইসঙ্গে, বর্তমান এই তথ্য জোয়ারের মধ্যে পাঠককে কোনো প্রতিবেদন পড়াতে চাইলে, তা আকর্ষণীয় এবং “সংবাদযোগ্য” হতে হবে। ফলে সময় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মাথায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে থাকছে কিছু পরামর্শ:

অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা


সবাই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ করে, তাই আপনার দূর্বলতাগুলো সনাক্ত করার চেষ্টা করুন এবং কোনো একটি ধাপে গিয়ে নিজেকে আটকে ফেলবেন না। যেমন একটি অনুসন্ধানের শুরুতে আপনার মনে হতে পারে যে, বিষয়টিতে আরও বেশি পড়াশোনা করা প্রয়োজন। কিন্তু পড়তে সময় লাগে। এবং বেশি পড়তে থাকলে আপনি আরো অনেক রেফারেন্স পেতে থাকবেন। এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এতো কিছু পড়ে ওঠা সম্ভব হবে না। ভালো উপায় হতে পারে ইন্টারনেটে বুদ্ধিমত্তার সাথে কিছু সার্চ করে জেনে নেওয়া। যেমন কিওয়ার্ডকে উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতর রেখে সার্চ দেওয়া। এতে অপ্রাসঙ্গিক অনেক লেখা ফিল্টার হয়ে যাবে। আপনার প্রতিবেদনের জন্য আগ্রহ-উদ্দীপক কিছু পাওয়া গেলে তার ওয়েব ঠিকানা বুকমার্ক করে রাখুন, যাতে পরে প্রয়োজনের সময় সহজে খুঁজে পান এবং সময় নষ্ট না হয়।

একইভাবে, শুধু একজন বিশেষজ্ঞের ওপরই সব আশাভরসা রাখবেন না। প্রাসঙ্গিক যত মানুষের সঙ্গে সম্ভব, বিস্তৃতভাবে যোগাযোগ করুন। অনুসন্ধানের শুরুর পর্যায়ে, আপনাকে ঘটনার গভীরে যাওয়ার বদলে বরং বিস্তৃত পরিসরে খোঁজ চালাতে হবে।

আপনাকে একটি সময়কাঠামোও ঠিক করতে হবে। এতে বুঝতে পারবেন, গবেষণার কোন পর্যায়ে কতটা সময় দেওয়া যাবে। অনুসন্ধানটি ভিন্ন কোনো বাঁক নিলে, শুরুর গাইডলাইন দেখে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন যে, আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। যা পেতে চাইছেন, তা পাওয়ার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে।

অনুমান বদলে গেলে কিভাবে প্রস্তুতি নেবেন


ধরা যাক, প্রাথমিক কিছু গবেষণার পর দূর্ভাগ্যজনকভাবে, আপনার গোটা অনুমানটাই বদলে গেছে। নতুন তথ্য পাওয়ার কারণে আপনার খবরের বিষয়টিকে নতুন করে সাজাতে ভয় পাবেন না। ভালো অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো নমনীয়তা। রিপোর্টিংয়ের শুরুতে যে ধারণা ছিল, তাকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করবেন না এবং নতুন পাওয়া তথ্যগুলো আদি ধারণার মধ্যে জুড়ে দেওয়ার কথা ভাববেন না।

নতুন করে যে অনুমানটি তৈরি করলেন, তার পটভূমি নিশ্চিত হলে, আপনার গবেষণাকে আরও গভীরে নিতে হবে এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো ছেঁটে ফেলে দিতে হবে। নিজের কাজ ছেঁটে ফেলতে একটু খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু করতেই হবে। পুরোনো নথি/নোটগুলো ফাইল করে রাখতে পারেন, যা ভবিষ্যতে কোনো প্রতিবেদনে কাজে লাগতে পারে। কর্তৃপক্ষের বা কর্মকর্তা পর্যায়ের কারো অর্থবহ মন্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করুন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এবং রেফারেন্সগুলো আবারও দেখে নিন। আনুমানিক বিমূর্ত বিষয়গুলোর বদলে আপনাকে এখন খুঁজতে হবে বাস্তব, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও রেফারেন্স। এবং এই পর্যায়েই আপনাকে বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই কোনো মামলায় জড়িয়ে পড়তে চাইবেন না। ফলে যেটার সত্যতা নিশ্চিত হতে পারবেন না, ছেঁটে ফেলুন। আপনার নোটের সঙ্গে মেলে না বা বিপরীতমুখী তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখুন সেগুলোর ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে কিনা? পক্ষপাতদূষ্ট সূত্র বিষয়টির কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? সব ক্ষেত্রে সবার মন্তব্য রেকর্ড রাখুন। তথ্য নিশ্চিত করুন, যাচাই করুন এবং আবারও যাচাই করুন।

কোন ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন এল তা সংশ্লিষ্ট সম্পাদককে জানিয়ে রাখুন, যাতে তিনি প্রয়োজনে পুনপরিকল্পনা করতে পারেন, পাতায় পরিবর্তন আনতে পারেন। জানানোর বিষয়টি আপনাকে যত দ্রুত সম্ভব করতে হবে। মানহানি বা মামলার ঝুঁকি থাকলে বিষয়গুলো সম্পাদককে জানিয়ে রাখুন। এই ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে আপনার সম্পাদক প্রয়োজনে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আইনজীবীকে দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে পারেন।

পরবর্তী অধ্যায় আপনাকে শেখাবে, গবেষণার শুরুতেই কীভাবে ডেটা সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হয়।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে বাসা থেকে কলেজছাত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

সিলেট থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু ?

উত্তরাঞ্চল সফর হলো না, তারেক রহমানের নির্বাচনী সফর সিলেট থেকেই শুরু?

ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি কে?

জকসু নির্বাচন : কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬৫ শতাংশ

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ প্রশ্ন করুন

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে পাবেন ভেতরের খবর

গবেষণা, গবেষণা, গবেষণা

তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষার কৌশল

১০

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?

১১

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের খবরের সন্ধান

১২

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে হবেন

১৩

জমে উঠেছে জকসু নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর হিড়িক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা

১৪

বিজ্ঞপ্তির ১ ঘণ্টা পরও ফল দেখতে পারছেন না জবির ভর্তিচ্ছুরা, ডিন বললেন- ‘ভুলে হয়েছে’

১৫

প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রিপোর্টে হাতে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

১৬

বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন

১৭

আপিলের প্রথম দিনে যে ৪২ আসনের আবেদন জমা পড়ল

১৮

চাঁদাবাজির মামলায় জামিন মুক্তি পেয়েছেন ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী

১৯

সারাদেশে শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর অভিযান

২০