প্রতিটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন শুরু হয় একটি ধারণা থেকে। কোথায় সেসব ধারণা মিলবে এই অধ্যায়ে তাই ব্যাখ্যা করা হবে। পত্রিকা পড়া, সূত্রের সঙ্গে আলাপ, প্রভাবশালী ব্যক্তির সাক্ষাৎকার কিংবা চারিদিকে নানাধরণের ঘটনাপ্রবাহের ওপর চোখ-কান খোলা রাখলে সম্ভাব্য খবরের ধারণা মেলে। এই অধ্যায়ে ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নেটওয়ার্কগুলোর ওপরও আলোকপাত করা হবে। কারণ, এসব মাধ্যমগুলো ব্রেকিং নিউজ ও প্রধান প্রধান খবরের ওপর নজর রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ইচ্ছামতো আরাম-আয়েশ করার সুযোগ নেই। নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে অজানা বিষয়ে অনুসন্ধান এবং পরিকল্পিত ঝুঁকি গ্রহণই অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাজ।
স্টোরি আইডিয়া কীভাবে পাবেন?
অধিকাংশ খবরের আইডিয়া বা ধারণা জন্মায় সাংবাদিকের নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে। আগের প্রতিবেদন বা চলমান ঘটনাগুলোর মধ্যে থাকা প্রশ্ন থেকেই এই ধারণা তৈরি হয়। কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে, বিষয়টিতে আপনার উৎসাহ তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কারও সঙ্গে আলাপচারিতা কিম্বা কারো কাছ থেকে শোনা কোনো মন্তব্য থেকেও খবরের ধারণা মিলতে পারে। এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি যে, সবসময়ে ও প্রতিবারই ভালো সংবাদের ধারণা মিলবে, বিষয়টা এতো সহজ নয়। সাংবাদিকদের কাছে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কাজই হচ্ছে ভালো একটা ধারণা দাঁড় করানো।
প্রথমত, কোনো প্রতিবেদনের ধারণা হুট কওে আপনার কোলে এসে পড়বে, এমন চিন্তা বাদ দিতে হবে। অনেক উঠতি অনুসন্ধানী সাংবাদিকের পেশাগত জীবনের যাত্রা শুরু হয় এমন কল্পনা নিয়ে যে অন্ধকার গলিতে কেউ এসে তার হাতে গোপন নথি তুলে দেবে। তাদের মনে হয়, একবার তথ্য প্রকাশ পেলে, সংবাদ ছাপা হবে প্রথম পাতায়। সবকিছু ভালো হলে মোটা হরফে স্বনামে সংবাদটি প্রকাশিত হবে। প্রশংসা, স্বীকৃতি ও পদক-পুরস্কারও জুটবে। অবশ্য, মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটেও। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির খবর অজ্ঞাতনামা একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যের মাধ্যমেই সূচিত হয়েছিল যার জেরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু সাধারণত, রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির ফোন বা অতি গোপন নথি প্রকাশের ঘটনা খুবই বিরল এবং এসব তথ্য খুব ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি যেমন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অসততার নজির, তেমনি রিপোর্টারদের একাগ্রতা এবং শ্রমেরও একটি উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, একজন সাংবাদিকের ছুটি বলে কিছু নেই। তাঁদের সব সময়ই চোখ খোলা রাখতে হবে। কাজে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনের দিকেও নজর রাখতে হবে। ইমিগ্রেশন কার্যালয়ের সামনে পাসপোর্টের পাওয়ার অপেক্ষায় মানুষের লম্বা সারি কিম্বা হাসপাতালে নার্সদের অসদাচরণ – এমন জায়গা থেকেও স্টোরি বেরিয়ে আসে, যদি তা রিপোর্টারের নজরে পড়ে। প্রথম নজরে যা দেখা যায়, সেখানে তার চেয়েও বেশি কিছু থাকতে পারে, যা কিছুটা অনুসন্ধান দাবি করে। এ সময় সংবাদ হতে পারে এমন ধারণাগুলো নোটবইয়ে লিখে রাখা উচিত। যা পর্যবেক্ষণ করলেন এবং যেসব প্রশ্ন আপনার মাথায় এসেছে সেগুলো লিখে রাখুন। ভালো হয় মুঠোফোনে এগুলো রেকর্ড করে রাখলে। ছবি তুলুন, ডায়াগ্রাম আঁকুন এবং তার ডিজিটাল কপিটি সঙ্গে রাখুন, যেন যেখানেই যাচ্ছেন, অনুসন্ধানটিকেও সেখানে সঙ্গে নিতে পারেন।
তৃতীয়ত, নিজের ইন্দ্রিয়ের ওপর ভরসা রাখুন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলার পর কোনো রিপোর্টার হয়তো এমন কিছু পেয়ে যেতে পারেন, যা অন্য কেউই খেয়াল করেনি। ঘটনাটি আপনার সঙ্গে ঘটেছে বলে যে অনুসন্ধানের গুরুত্ব কমে যাবে, তা নয়। রিপোর্টাররা সবচেয়ে ভালো প্রত্যক্ষদর্শী। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দিন। আপনার অভিজ্ঞতা দিনশেষে কাজে না-ও আসতে পারে, কিন্তু তাই বলে, একটু পরীক্ষা করে দেখার প্রাথমিক ধাপ থেকে সরে আসবেন না।
প্রতিবেদনের ধারণার জন্য পড়াশোনা
আপনি যদি সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে পড়াশোনা করাটা শুধু ইচ্ছের বিষয় না, এটি একটি পেশাগত দায়িত্ব। এটি আপনার লেখার দক্ষতাই বাড়ায়। একই সঙ্গে আপনি নানা বই-প্রবন্ধ থেকে বুঝতে পারেন: কিভাবে নানা ব্যবস্থা-পদ্ধতি কাজ করছে। এটি বুঝতে না পারলে কোনটা খারাপ কাজ হচ্ছে, আর কোনটা ভালো কাজ হচ্ছে, তা ধরতে পারবেন না। আপনার কাছে স্বাভাবিকভাবে যেসব তথ্য আসছে সেগুলোর পিছনে বেশি সময় ব্যয় না করে বরং আপনার জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে নতুন নতুন তথ্য অনুসন্ধান করা উচিত।
ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টারস অ্যান্ড এডিটরসের (আইআরই) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ব্র্যান্ট হিউস্টন আইআরই‘র ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টারস হ্যান্ডবুকের পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অনেক বীজ বহন করে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত নাম পরিবর্তন, ক্রয়-বিক্রয়, দরপত্রের মতো আইনি নোটিশে (বিজ্ঞাপন) লুকিয়ে থাকে ভালো সংবাদ কাহিনি। আপনার কাজ হলো সতর্ক থাকা ও কী-কেন হচ্ছে তা খুঁজে বের করা। সাংবাদিকেরা যে কাজটি খুব কমই করেন তা হলো প্রকাশিত খবরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে নজর রাখা বা ফলো-আপ। পাঠক জরিপ ও ফোকাস গ্রুপ থেকে দেখা গেছে, পাঠকরা ফলোআপ নিউজ পড়তে বেশি পছন্দ করেন। তাঁরা জানতে চান ঘটনার পরবর্তীতে কী ঘটল। কেন এটা ঘটল। সংক্ষিপ্ত, সাদামাটা প্রতিদিনকার সংবাদের পেছনের ঘটনা কি সেটা জানতে চান পাঠকেরা। বিশেষভাবে সেসব সংবাদের দিকে নজর দিন যেখানে, ঘটনাটি কেন ঘটেছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা কোনো ঘটনা শুধু একটি আঙ্গিক থেকে তুলে আনা হয়েছে। অবশ্যম্ভবী খবর কিম্বা নিয়মিত ঘটনা – যেমন বিভিন্ন বৈশ্বিক বা জাতীয় ঘটনার বার্ষিকীকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখারও চেষ্টা করা উচিত। অনেক পড়াশোনা করলে আপনি নীরবে আড়ালে চলে যাওয়া অনেক ঘটনার দিকেও নজর রাখতে পারবেন। যেমন, অনেক প্রশংসিত কোনো সরকারী নির্মান প্রকল্প।
সরকার ও এনজিওর প্রতিবেদনগুলো নিরস মনে হলেও সেগুলো আপনার পড়া উচিৎ। অপ্রতুল সম্পদ ও ভৌগোলিক কারণে বিদেশি অনেক প্রকাশনা ও ওয়েবসাইটে আপনার প্রবেশাধিকার সীমিত থাকতে পারে, তবুও অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের সম্ভাব্য সব পথ কাজে লাগানো উচিত যা তাকে হালনাগাদ থাকতে সাহায্য করবে। দূতাবাস ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন তথ্যকেন্দ্রে বিনা খরচে পড়ার কক্ষ ও গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ থাকে। সেখানে গিয়ে আপনি এগুলো দেখতে পারেন।
প্রাত্যহিক অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: বিভিন্ন ক্ষেত্রের সূত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা, যেন অন্য রিপোর্টাররা খবর পাওয়ার আগেই সেটি আপনি জেনে যান। আর এজন্য কোনো কারণ ছাড়াই নিয়মিত যোগাযোগ দরকার হয়। যদি আপনি শুধু প্রয়োজনের সময়ই সোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে সে মনে করতে পারে: আপনি তাকে ব্যবহার করছেন। এই ব্যাপারটিকে বলে সূত্রের সঙ্গে কাজ করা। কিন্তু এসব সূত্র থেকেও কোনো প্রতিবেদনের ধারণা এমনিতেই আপনার কাছে এসে পড়বে না। আপনাকে সেগুলো খুঁজে বের করার জন্য সৃজনশীল ও কৌতুহলী হতে হবে।
আপনার যদি সব সময় ইন্টারনেট সুবিধা থাকে, তাহলে আপনি নিউজ সাইট, এবং ফেসবুক ও টুইটারের মত সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন। এখানে আপনি বিভিন্ন বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভিন ভিন্নœ মতামত পাবেন। সেখান থেকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পেয়েও যেতে পারেন। টুইটার ফিডগুলো সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিষয়ের সর্বশেষ ও মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভান্ডার। ২০১৬ সালের নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের পুনর্জাগরণ হয়েছে। এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে প্রেসিডেন্টের অনেক বড় বড় বিবৃতি। সেটি বাদ দিলেও, তাৎক্ষণিক নানা সংবাদ পাওয়ার ভালো উৎস হতে পারে এটি। গ্রামীন এলাকার সাংবাদিকদের জন্য অনেক উপকার হতে পারে, যদি তাঁরা বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবীদ ও অন্যান্য সাংবাদিকদের ফলো দিয়ে রাখেন।
প্রতিবেদনের ধারণা পরখ করে দেখা
কোনো প্রতিবেদনের আইডিয়া বা ধারণা আপনি যেভাবেই পেয়ে থাকুন না কেন, তার পরবর্তী পদক্ষেপটি হচ্ছে: এটি আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা পরখ করে দেখা। সম্ভাব্য পক্ষপাত ও বাধাবিপত্তি সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
ব্যক্তিগত বিষয়
একটি সংবাদের ধারণা নিয়ে কাজ করার সময় দুটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি অনুসন্ধানের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। অনুসন্ধানের সময় সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণে আপনি রুষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। আর সেই কারণে সংবাদে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের পরিবর্তে রিপোর্টটি দোষারোপ ও অভিযোগের দিকে চলে যেতে পারে। সাংবাদিকতার মূল নীতিগুলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন। বিশ্¦স্ত পরামর্শক বা সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। এবং এটি যেন তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবসময়ে প্রতিনিধিত্বশীল নাও হতে পারে। আপনি শুধুমাত্র একজন। তাই আপনার মতো আরও কত লোক একই সমস্যায় ভুগেছেন তা বোঝা প্রয়োজন। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন আসতে পারেÑ আপনি একজন সাংবাদিক অথবা একজন পুরুষ অথবা একজন নারী অথবা একজন শিক্ষিত ব্যক্তি হওয়ার কারণে কি বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন? অন্যদেরও কি একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে? এই সমস্যা কি প্রতিদিনই ঘটে? বা আজকেরটা কি ভিন্ন? এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার উপায় হলো একটি একক ঘটনার বাইরে গিয়ে বৃহৎ পরিসরে প্রতিবেদন করা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যায় মতামত কলামে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নয়। একটি যথার্থ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে হলে সমস্যার কারণ জানতে হবে, পটভূমি বুঝতে হবে এবং বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে যাতে প্রতিবেদনটি কোনো একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের বদলে সমস্যাটির প্রতিনিধিত্ব করে।
যাঁদের আপনি চেনেন ও যাঁদের সঙ্গে কাজ করেন তাঁদের সবার ক্ষেত্রেই এসব সুবিধা ও অসুবিধার বিষয়টি প্রযোজ্য। হয়তো তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা চরম সত্য, কিন্তু তা প্রতিনিধিত্বশীল নাও হতে পারে এবং তাতে ব্যাক্তিগত অনুভূতির ছাপ পড়তে পারে। এ ছাড়া, যেসব বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত ব্যক্তি কোনো ঘটনা, সমস্যা বা বিষয়ে সরাসরি জড়িত নয়, তাদের দেওয়া তথ্যের বিষয়ে সর্তকতা প্রয়োজন। এরকম তথ্যের ক্ষেত্রে আপনি যদি কারো নাম-পরিচয় সংগ্রহ করে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে না পারেন, তাহলে মনে করতে হবে এটি একটি গুজব। এ রকম তথ্য এড়িয়ে যাওয়া উচিত। তাই, আবারও বলছি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেবল একটি ভালো অনুসন্ধান সূচনা করতে পারে, এর বেশি কিছু নয়।
এবিষয়ে সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের (সিআইজে) পরামর্শ: “আপনি এমন অনেক লোককেই চিনতে পারেন, পেশাগত কারণে যাঁরা তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উদাহরণ হিসাবে পুলিশবাহিনীর সদস্যদের কথা বলা যায়। তাই চেনা লোকদের আপনি কীভাবে ব্যবহার করবেন সেই বিষয়ে প্রথমেই চিন্তা করে নিন। এমনটা মনে করবেন না, কেউ একজন বন্ধু বা প্রতিবেশি হওয়ার কারণে নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ ভুলে গিয়ে আপনাকে সাহায্য করবে। তথ্য প্রকাশ তাঁদের জীবনেও বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই কারও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের আগে সব সময় তাঁর অনুমতি চেয়ে নিন।”
গালগল্প ও গুজব যাচাই
গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটা ছড়ানোর জন্য রাস্তার পাশের গালগল্প, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের চটকদার কথাবার্তা, ট্যাক্সিচালক ও যাত্রীদের কথোপকথন, গলফ কোর্সের ক্যাডি, ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক লোকজন, জমির দালাল, পুলিশের সদস্য এবং ক্যাফে ও পানশালার কর্মীর চেয়ে কার্যকর অন্য কোনো মাধ্যম নেই। তবে, গালগল্প বা রটনা এবং গুজব আমাদের বাস্তব ঘটনা ও পরিবর্তনের বিষয়ে সজাগ করতে পারে। কোনো এলাকায় নারীদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কারণ কি মানবপাচার? লোকজন কি ঘরে বানানো চোলাই মদে আসক্ত হতে শুরু করেছে? নামকরা একজন ব্যবসায়ী কি হঠাৎ করে পয়সাকড়ি খরচ করা বন্ধ করে দিয়েছেন? কিম্বা, একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা কি কুখ্যাত অপরাধীদের সঙ্গে সামাজিকভাবে মেলামেশা শুরু করেছেন? এসব ঘটনার অগ্রগতির বিষয়ে রাস্তার পাশের আলোচনাই আপনাকে তথ্য দেবে এবং এসব কাহিনীর অনেকগুলো সত্যও হতে পারে। কিন্তু, সাংবাদিকদের এসব ক্ষেত্রে নিজের কাছেই প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ কেন এগুলো বিশ্বাস করছে। এগুলো আমাদের এই বর্তমান সময় বা দেশ সম্পর্কে আসলে কী বলছে?
প্রথম পদক্ষেপে এসব গুজবের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। যাদের বিষয়টি জানার কথা সেরকম সূত্রগুলো থেকে সব সময় যাচাই করতে হবে। তারপর, যতটা পারা যায় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য নিতে হবে। যেমন: নিখোঁজ মেয়েটির খবর নিশ্চিত করতে স্থানীয় থানায় খোঁজ নিতে হবে। অ্যালকোহল অপব্যবহারের বিষয় হলে চিকিৎসকরা তা জানবেন। ব্যবসায়ীর বিষয়ে খবর নিতে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলছে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে খোঁজ করতে হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানবেন বাজারের প্রবণতার কথা। যখন কোনো গুজবের কিছু ভিত্তি মিলবে, তখন সেটা ধরেই প্রতিবেদনের পরিকল্পনা শুরু হতে পারে।
গোপন সূত্রের তথ্য মূল্যায়ন
অপরাধ ও অনাচার ফাঁস করা অনেক প্রতিবেদনেরই সূচনা হয় গোপন সোর্স বা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুলিশ বিভাগে আপনার একটি সূত্র গাড়ি চুরির চক্রের সঙ্গে একজন কমিশনারের জড়িত থাকার কথা জানেন। প্রতিহিংসা-পরায়ণ এক নারী পত্রিকা অফিসে ফোন করে তাঁর প্রাক্তন স্বামীর আয়কর ফাঁকির তথ্য জানাতে পারেন। আবার, সরকারি চুক্তি পেতে একটি কোম্পানির সঙ্গে সরকারি দরপত্র বোর্ডের একজন সদস্যের অন্যায় সম্পর্কের কথা বন্ধুর মতো সম্পাদককে কথাচ্ছলে জানাতে পারেন একজন রাজনীতিবিদ।
কিন্তু, এসব তথ্য যেমনটি ধারণা করা হয় তেমন নাও হতে পারে। এমনকি অসত্য বা কাউকে ফাঁসানোর জন্য সাজানোও হতে পারে। এগুলো আংশিক সত্য হতে পারে, যাতে করে অন্য কারো উদ্দেশ্য (এজেন্ডা) হাসিল হয়। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এগুলো ব্যবহার করে আপনাকে দিয়ে একটা রিপোর্ট করানোর চেষ্টাও হতে পারে। এক্ষেত্রে, প্রথমেই যে কাজটি অবশ্যই করতে হবে তা হলো আপনাকে যে গোপন তথ্য দেওয়া হয়েছে সেটি সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য নিয়ে কাজ করার সময় প্রথমে যেসব প্রশ্ন করা উচিত :
- > গোপন সূত্র থেকে তথ্য না পেলেও কি আমি বিষয়টি নিয়ে লিখতাম?
- > বিষয়টা কি এমন যা সম্পর্কে আমার আগ্রহ রয়েছে?
- > যে সত্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে সত্যিই কোনো জনস্বার্থ আছে?
এই তিনটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই আপনার উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি কাজ শুরু করতে পারেন।
দুর্নীতি: মুদ্রার দুই পিঠের মতো বিষয়
দরপত্র বোর্ডের সদস্যের দুর্নীতি কিম্বা প্রাক্তন স্বামী/স্ত্রীর কর ফাঁকির ঘটনাগুলোতে এসব প্রশ্নে আপনার উত্তর কী হবে? আরও একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির ঘটনা প্রকাশের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের ওপর তেমন কোনো বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। যেসব দেশে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পদ্ধতিগত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কিছু সামাজিক গোষ্ঠীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সেখানে এধরণের তথ্য কোনো বড় প্রভাব ফেলার কথা নয়। সাংবাদিকরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে এরকম দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে অন্যরা ভয় পাবে এবং দূর্নীতিবিরোধী লড়াই কিছুটা এগুবে। এর কিছুটা সত্যতা আছে। দুর্নীতির খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কারণে সম্ভাব্য কিছু অসাধু, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি হয়তো নিবৃত্ত হবেন এবং অল্প কিছু অর্থও হয়তো রক্ষা পাবে। যেহেতু এসব অর্থ করদাতাদের, তাই সাধারণ মানুষের বিষয়টি জানারও অধিকার রয়েছে। কিন্তু, দেখা গেছে যে অগণিত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশে পদ্ধতিগত দুর্নীতিতে তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। কারণ, রাষ্ট্রের সব কাঠামো ও লেনদেন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ঢুকে গেছে। এমনকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। ফলে মানুষ হয়তো এসব প্রতিবেদন দেখবে আর ভাববে, “এ আর নতুন কী? ”
কিন্তু, সাংবাদিকরা যদি এমন পদ্ধতিগত ত্রুটি তুলে ধরতে পারেন যার কারণে করফাঁকি ও ঘুষ গ্রহণ সহজ হয়ে গেছে, তাহলে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, এবং তাতে হয়তো ঘটনার সাথে জড়িত পক্ষগুলোর জন্য নিজেদের লুকোনো আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
কীভাবে সূত্রের তথ্য, গুজব ও প্রকৃত ঘটনা যাচাই করতে হয় ?
শুরু করুন আপনার সূত্রের প্রাথমিক তথ্য মূল্যায়ন দিয়ে। যেমন, কারো কাছ থেকে কোনো খবর পেলে বা কোনো ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নাম-ঠিকানাহীন খোলা চিঠি থেকে তথ্য পেলে, আপনার অবশ্যই জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, এটি কে লিখেছে। তার বিশ^াসযোগ্যতা আছে কিনা, উদ্দেশ্য কী? যে কেউ যে কোনো বিষয় ইন্টারনেটে প্রকাশ করতে পারেন। এখানে সত্যিকারের বিশেষজ্ঞ যেমন থাকতে পারেন, তেমনি ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের লবিস্টও থাকতে পারে।
আপনি যদি ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করে ফেলতে পারেন, তাহলে আপনাকে নামতে হবে তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যতটা পারা যায় পড়ে ফেলতে হবে। তার জীবন-কাহিনী জানার চেষ্টা করতে হবে: কোথায় তিনি পড়াশোনা করেছেন, তাঁর কী কী ডিগ্রী আছে? তাঁদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও টুইটগুলো পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কোনো নতুন উদ্যেগের কথা জানা গেলে, এর পেছনে প্রধান প্রধান উদ্যোক্তা কারা তা অনুসন্ধান করতে হবে। তাঁদের সহকর্মী, প্রতিপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্রের বিষয়টি বারবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একজন নতুন কৃষিমন্ত্রী যদি শস্য বাণিজ্যে নিয়োজিত একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির বোর্ডে থাকেন, তখন এটা বৈধ কিনা তা যাচাই করতে হবে। এমনকি এই রকম পদে থাকা বৈধ হলেও, স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি কী উল্লেখ করা হয়েছে? এই ধরনের বিষয়গুলো জানতে পারলে শুধু সোর্সের দেয়া তথ্য মূল্যায়ন সহজ হবে না, পরে আপনার প্রতিবেদনের জন্যও প্রয়োজনীয় অনেক ধারণা পাবেন।
সেই ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছে, এমন মানুষদের সঙ্গে কথা বলুন। তারা সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কী বলছে? কী হবে যদি আপনার চিন্তা করা ধারণার সাথে তাদের কথা না মেলে? আপনি হয়তো ভুল পথে চলে যাবেন। আবার সেই ব্যক্তির ‘ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের’ ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন। তাদের সব কথা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস করবেন না।
জ্বালানি, জমি কিংবা বৃত্তির মতো কোনো কিছুর অপ্রতুলতা নিয়ে প্রতিবেদন পড়ার সময়ও কিছু প্রশ্ন মাথায় আসার কথা। এগুলো কারা নিয়ন্ত্রণ করেন? কীভাবে বণ্টন কার্যক্রম পরিচালিত হয়? এসব প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে সম্ভাব্য কোনো দুর্নীতি সনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা এখান থেকে ধারণা পেতে পারেন যে: ঐ ব্যক্তিরা কতটা সত্য উন্মোচন করেছেন এবং কতটা লুকিয়েছেন।
অভিযোগের পক্ষে যেসব তথ্যপ্রমাণ হাজির করা হচ্ছে, তার যথার্থতা নিয়েও আপনার প্রশ্ন তোলা উচিৎ। মিথ্যা বা খ-িত কোনো অভিযোগের জন্য ‘প্রমাণ’ হাজির করা এখন খুবই সহজ। অফিসিয়াল লেটারহেড (বা ফটোশপ), কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ার থাকলেই এখন এসব প্রমাণ তৈরি করে ফেলা যায়। এমনকি তাঁদের নথিপত্র আসল হলেও, দেখা যাবে আপনাকে শুধু বেছে বেছে অল্প কিছু নথি দেয়া হয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বর্পূণ কিছু নথি বাদ রাখা হয়েছে, যাতে পরে বলা যায় আপনার রিপোর্ট খন্ডিত বা অর্ধসত্য।
কখনো কখনো তথ্যগুলো এতোটাই জটিল বা টেকনিক্যাল হতে পারে যে বিশেষজ্ঞ নন এমন সাংবাদিকের পক্ষে তা বুঝে ওঠা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, এবং অন্য কারো বিশেষজ্ঞ-জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ রকম তথ্য নিয়ে আলোচনার জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। সেই বিশেষজ্ঞ হতে পারেন হিসাবরক্ষক, আইনজীবী বা চিকিৎসক। আবার এমনকি দেখতে সাদামাটা মনে হলেও কোনো কোনো নথিতে অপব্যাখ্যার ঝুঁকি থাকে। মাঝে মধ্যে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও দেখা যেতে পারে অসদাচরণ অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। যখন দুর্নীতির অভিযোগ যখন মশামাছির মতো উড়ে বেড়ায়, তখন সাংবাদিকদের খুবই সতর্ক থাকতে হয়, যেন তাঁরা তথ্যদাতার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের ব্যবহৃত না হন।
|
১১ জানুয়ারী, ২০২৬