রবিবার , ১১ জানুয়ারী ২০২৬
studentnewsbd
৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১:৪৭ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়

 রিপোর্ট লেখা

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়। রিপোর্টটি অবশ্যই পাঠকদের কাছে বিশ^াসযোগ্য হতে হবে, তাই তথ্য হতে হবে হালনাগাদ ও সময়োপযোগী। তার সাথে প্রাসঙ্গিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুসন্ধানী রিপোর্টকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলবে, প্রতিবেদনের ওজন বাড়াবে। গ্রাফ, চার্ট ও ডায়াগ্রামের ব্যবহার পাঠককে রিপোর্টের জটিল বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।

প্রতিবেদন লিখবেন কীভাবে?


কোনো প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাঠকদের মনে প্রভাব ফেলতে চাইলে আপনাকে এর মূল বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রটি তুলে ধরতে হবে। পাঠকের মনোযোগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে জেষ্ঠ্য মার্কিন সাংবাদিক স্টিফেন ফ্রাঙ্কলিনের পরামর্শ হলো, শুরুতেই অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রাধান্য দিন, যাতে একটা জোরালো সূচনার ছবি পাওয়া যায়। প্রথমে জানানো উচিত শুধু ন্যূনতম মৌলিক তথ্য, যার বিস্তারিত পরে আপনি খোলাসা করবেন। তবে, আপনি যা খুঁজে পেয়েছেন সেটি সততার সঙ্গে লেখাও জরুরি। রিপোর্টের সঙ্গে যায় না এমন বিষয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না বা ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর প্রমাণ করার প্রচেষ্টায় যাবেন না। পাঠকের বিশ^াস অর্জনের বিষয়টি আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই, আপাতদৃষ্টিতে অসত্য বলে মনে হয়, এমন বর্ণনা দিয়ে শুরু করলে আপনার পুরো উদ্যোগই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তথ্যগুলো দেওয়ার পর আপনি আপনার অনুসন্ধানের উদঘাটনগুলো সংক্ষেপে জানিয়ে সেগুলোর প্রমাণ তুলে ধরুন। শব্দচয়নে অসতর্কতা বা তথ্য প্রমাণের সংযুক্তিতে দুর্বলতা রেখে আপনার প্রতিবেদনটি খেলো বানিয়ে ফেলবেন না। এমন করলে, যদি কপাল ভালো থাকে, দেখা যাবে, প্রতিবেদনটি নিরেট হয়নি। আর সবচেয়ে খারাপ হলে দেখা যাবে এটি মানহানিকর হয়ে গেছে এবং তাতে আপনার বিশ^াসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে।
মনে রাখার মতো কয়েকটি বিষয় এখানে:

হতে হবে নির্ভুল


বর্ণনা ও উদাহরণ: আপনার পাঠকদের জন্য পেশাজীবিদের ব্যবহৃত বিশেষ ভাষা ও জটিল বিশেষণের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং রিপোর্টজুড়ে একই ব্যাখ্যা বজায় রাখতে হবে। এছাড়া, উদাহরণের মাধ্যমে এসব জটিল শব্দগুলোকে বোধগম্য করতে হবে।

অপ্রমাণিত বিষয়ের সরলীকরণ: ‘সর্বাধিক’, ‘অনেক’, ‘কিছু’, বা ‘কয়েকটি’ এমন শব্দগুলোর পার্থক্য ও অর্থ বুঝতে হবে। যথাযথভাবে শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ‘সর্বাধিক’ ও ‘অনেক’ এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে অতি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং ‘সবাই’ বা ‘কেউ না’ এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে আরও সাবধানী হতে হবে। কোনো কিছু কি ‘একমাত্র কারণ’ নাকি ‘অনেকগুলো কারণের একটি’? এটা কি ‘সবসময়ই’ নাকি ‘প্রায়শই’? বাস্তব উদাহরণ ও নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝাতে হবে।

যুক্তিকে শক্তিশালী করুন: সাবধানতার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে সব বক্তব্য-বিবৃতির যুক্তিগুলো তুলে ধরুন। যখন আপনার একটি ধারণা বা আইডিয়াকে সমালোচনা করার কথা তখন কোনো ব্যাক্তিকে আক্রমণ করবেন না। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে আলোচনার মধ্যেই থাকুন। কোনো সুবিধা নেওয়ার বিষয় সিদ্ধান্তগ্রহণের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাব ফেলেছে কিনা তা পাঠককেই ঠিক করে নিতে দিন। কখনো কখনো তথ্যপ্রমাণগুলোই আপনার হয়ে কথা বলবে।

প্রমাণ হিসেবে কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি: কোনো বিষয়ে ভালো ও মন্দগুলোর তালিকা করুন এবং সেগুলো ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখুন। কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের পেছনের কারণগুলোতে মনোযোগ দেওয়াও গুরুত্বর্পূণ। কেউ কিছু বললে তা কেন বলেছেন সেটা বোঝা দরকার। ঘটনার পটভূমি এবং উদ্ধৃতির জন্য একটি উৎস নয় বরং প্রাসঙ্গিক একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলুন, গবেষণা করুন।

সংস্কার, গৎবাঁধা বা আবেগ: গৎবাঁধা, ইতিবাচক কিম্বা নেতিবাচক ভাষা এড়াতে হবে এবং তা হতে হবে নিরপেক্ষ। আর, সব সূত্র ও বিষয়ের ক্ষেত্রে সমান সংযমী সংশয় থাকা ভালো।

জিজ্ঞাসা করা, ‘তাহলে কী’?: আপনার হাইপোথিসিসের সঙ্গে কোনো তথ্য প্রাসঙ্গিক কিনা, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি ভালো উপায় নিজেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা ‘তাহলে কী’? একটিমাত্র সহায়ক বা সমর্থনসূচক প্রমাণের বদলে বেশি সাক্ষ্য ও নজির দিতে পারলে তার গুরুত্ব অনুসন্ধানী রিপোর্টকে যথাযথ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। আপনার কাছে অনেক বেশি স্বাক্ষ্য ও নজির থাকলে সেগুলোকে স্পষ্ট করুন এবং বাহুল্য বর্জন করুন। এমনকি, আপনি আবারও সূত্রের কাছে ফিরে গিয়ে বিষয়গুলের আরও বিশদ ব্যাখ্যা জানতে চাইতে পারেন। আপনি হয়তো পটভূমিটাও আগেভাগে ব্যাখ্যা করে দিতে চাইবেন। এতে করে ঘটনার সময়কার পরিবেশ-পরিস্থিতি ও ফলাফল সম্পর্কে পাঠকদের আরও ভালোভাবে ধারণা দেওয়া সম্ভব। এছাড়া, আপনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন তাদের সেরকম কাজে জড়িত হওয়ার কারণ, উদ্দেশ্য এবং সুযোগ ছিল কিনা সে বিষয়েও তথ্য যুক্ত হবে।

অনুচ্ছেদ পর অনুচ্ছেদ সাজিয়ে লেখা


আপনার প্রতিবেদনটি চিন্তা করুন বেশ কয়েকটি পর্বের সমষ্টি হিসেবে। এবং প্রতিটি পর্বে থাকবে বেশ কিছু অনুচ্ছেদ। এই পর্বগুলোতে (যেমন: একটিতে জাতীয় কেলেঙ্কারির প্রধান কুশীলবদেও নিয়ে কথা বলা হয়েছে, একটিতে গুপ্ত সংগঠনের ইতিহাস ও তাদের গড়ে ওঠা নিয়ে আলাপ করা হয়েছে) আপনার পুরো অনুসন্ধানটির একেকটি দিক উঠে আসবে। এবং সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে। এভাবে আপনি একটি বৃহৎ দৃশ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করতে পারেন। এতে আপনার পাঠকের জন্য বুঝতে সুবিধা হবে। এটি একটি ‘মূল বাক্য’ দিয়ে শুরু হয়, যা পাঠককে বোঝায়, কোন দিকটি আপনি তুলে ধরতে চাইছেন অথবা আগে যা ঘটেছে তার সঙ্গে এটি কীভাবে সম্পর্কিত। প্রতিটি অনুচ্ছেদে নিচের বিষয়গুলো থাকা উচিত:

  1. (১) তথ্য-প্রমাণ (বিস্তারিত, বিবৃতি, যুক্তি, সংখ্যা)
  2. (২) সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা
  3. (৩) প্রসঙ্গ, ইতিহাস, তুলনা বা পার্থক্য
  4. (৪) কারণ কিংবা প্রভাব
  5. (৫) পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি
  6. (৬) ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ বা পরামর্শ

দৈনিক পত্রিকায় কাজ করা সাংবাদিকরা প্রায়শই অনুচ্ছেদ করে গল্প লেখার শৈশবের অভ্যাসটি ভুলে যান। এর কারণ হলো পত্রিকাগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের করা অনুচ্ছেদে রিপোর্ট ছাপে। সহ-সম্পাদকরা লাইন বাড়ানোর জন্য অনুচ্ছেদ ভেঙে ফেলে অথবা কয়েকটি অনুচ্ছেদ একত্র করে জায়গা বাঁচায়। এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। প্রতিটি রিপোর্টকে দাঁড় করানোর জনে অনুচ্ছেদ একটি অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়। পরিকল্পনা করুন এবং সেই অনুযায়ী অনুচ্ছেদ করে লিখুন। বিন্যাসের বিষয়টি নিয়ে সহ-সম্পাদকদের ভাবতে দিন।

১.২.১ উদ্ধৃতি ব্যবহার


পুরো কাহিনী বলার জন্য নয় বরং কোনো যুক্তির জন্য উদ্ধৃতি ব্যবহার করুন। তা যেন আবার একই কথার পুনরাবৃত্তি না করে, বরং বাড়তি তথ্য জানায়। তবে, মৌলিক ও প্রকৃত তথ্য দেওয়ার জন্য উদ্ধৃতির ব্যবহার না করাই ভালো। সূত্র আপনাকে যা বলেছে তা বিশ্লেষণের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং গল্পকে আরো বর্ণিল করতে এবং সূত্রের সঙ্গে আপনার কথোপকথন দেখাতে উদ্ধৃতি ব্যবহার করুন। আপনাকে মানুষ যা বলেছে হুবহু সেই শব্দগুলো ব্যবহার করা গুরুত্বর্পূণ। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমগুলো হলো:

  • >   কোনো ব্যক্তি এমন কিছু বলেছেন যা বোঝা কষ্টকর অথবা তাঁকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করতে পারে এবং তার বক্তব্যের ‘স্বপক্ষে’ কিছুই যুক্ত করে না।
  • >   অবমাননা ও অশ্লীলতার বিষয়গুলো যদি আপনার প্রকাশক অনুমোদন না করেন।
  • >   ‘দেখুন’, ‘আপনি জানেন’, ‘আমি মনে করি’ জাতীয় কথার কথা। শব্দগুলো অপ্রয়োজনীয় এবং কোনো কিছুই যুক্ত করে না।

সব উদ্ধৃতিতে বক্তার পরিচয় দিন এবং আপনি নিজে যা দেখেননি তার বিবরণে সূত্রকে উদ্ধৃত করুন। অনুসন্ধানী রিপোর্টে সূত্রের পরিচয় দিয়ে উদ্ধৃতি প্রকাশ অন্য সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। কারণ আংশিকভাবে হলেও পাঠকরা সূত্র দেখেই আপনার তথ্য-প্রমাণের মূল্য বিচার করবে। এছাড়া, রিপোর্টে কোনো নতুন বক্তার কথা ব্যবহারের আগে তা পরিষ্কারভাবে জানান। যদি কোনো কারণে বক্তার পরিচয় জানাতে না পারেন, তাহলে তার কারণ ব্যাখ্যা করুন : যেমন, সাক্ষাৎকারদাতা বলেছেন “আমি এই বিষয়টি দেখিয়েছি জানলে, কোম্পানি আমাকে বরখাস্ত করবে।”

উদ্ধৃতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে বাছাই ও উপস্থাপন:

  • >   একটি উদ্ধৃতির আগের লাইনটি পাঠককে যেন বুঝতে সাহায্য করে যে পরবর্তীতে কী আসছে।
  • >   উদ্ধৃতির জন্য আপনার উপস্থাপনার বার্তা সামঞ্জস্যর্পূণ হওয়া উচিত।
  • >   উদ্ধৃতির বর্ণনায় “তিনি বলেন’ কথায়ই থাকুন। অন্যান্য শব্দ (‘দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন’, ‘দাবি করেন’, ‘যুক্তি দেন’) হয়তো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বা (‘খন্ডন’, ‘প্রত্যাখ্যান’) এমন শব্দের ব্যবহারের কারণে পাঠক ভুল বুঝতে পারে। শুধুমাত্র যথাযথ বলে নিশ্চিত হলেই লেখায় একটা বাড়তি স্বাদ যুক্ত করতে কোনো নির্দিষ্ট বিশেষণ ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • >   আপনি যখন তা অন্যকথায় প্রকাশ করবেন তখন কোনো প্রলেপ দেওয়ার জটিলতায় যাবেন না। মূল উৎসের অর্থ ও সুর ঠিক রাখুন। যদি কোনো মুখপাত্র বলেন, “আমাদের বাজেট নেই,” এটি অন্যকথায় প্রকাশের ক্ষেত্রে বলবেন না যে, “তিনি বলেছেন তার প্রতিষ্ঠান এই খরচের জন্য প্রস্তুত নয়”, যা আসলে শুধু আর্থিক অবস্থা না বুঝিয়ে মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।

১.৩ খসড়া শেষ, আবার লিখুন


এই পর্যায়ে, আপনার সব উপাদান কোন অংশে কীভাবে যাবে তা বাছাই এবং সব উদ্ধৃতি ও গবেষণার তথ্য সাজানোর ধারণা ঠিক হয়ে গেছে। এখন আপনার প্রথম খসড়াটি লেখার সময়। অনেকেই প্রথম খসড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ভুল বোঝে। এটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নয়, তাই চূড়ান্ত বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং এটি হলো একটি নকশা, যা আপনাকে রিপোর্টটি কেমন দেখাবে বুঝতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে আরও কিছু কাজ করতে হবে কিনা তা বুঝতেও এটি সহায়তা করে। এই পর্যায়ে, আপনার মার্জিত ভূমিকা, পরিচ্ছন্ন সমাপ্তি বা পরিশীলিত ভাষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এখানে আপনি লিখছেন, সম্পাদনা করছেন না। আপনি যা করছেন, তা হলো, আপনার সব তথ্য-উপাত্ত বা লেখার মালমসলা একসঙ্গে কাগজে লিখে রাখছেন।

প্রতিবেদনের গঠন ও শৈলী


অনুসন্ধানমূলক, নিরেট সংবাদ বা ফিচার যাই হোক না কেন- রিপোর্টের জন্য মূলত তিনটি মৌলিক কাঠামো আছে:

  1. (১) সময়ানুক্রমিক – যেখানে সময়ের সাথে সাথে রিপোর্টটি ফুটে ওঠে, আর ক্রম ও ক্রিয়া এখানে তদন্তের উপাদান
  2. (২) বর্ণনামূলক – নির্দিষ্ট সময় ধরে একটি পরিস্থিতি অনুসরণের মাধ্যমে ঘটনা উন্মোচনের বিবরণ তুলে ধরে
  3. (৩) প্রক্রিয়াগত – যেখানে রিপোর্ট এগিয়ে চলে বিষয় ও যুক্তিগুলোকে ঘিরে

সমস্যা বা ইস্যু, কে বা কারা ক্ষতিগ্রস্ত, বিরোধ বা সংঘাত এবং আপনার অনুসন্ধানে পাওয়া বিষয়গুলো বাছাই করে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে আপনি লেখা শুরু করুন। তুলনামূলকভাবে সহজ ও সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে, কয়েক মাস বা বছরের বদলে যেটি কয়েক সপ্তাহেই শেষ হয়ে যায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে ভূমিকা ও উপসংহারসহ এই অংশগুলো আপনার চূড়ান্ত রিপোর্টের জন্য সন্তোষজনক একটি ছক তৈরি করে দিতে পারে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখায় সাহিত্যিক নৈপুণ্য দ্বিতীয় স্থানে থাকে। কেন্দ্রে থাকতে হবে তথ্যউপাত্ত। যে কোনো ক্ষেত্রে, একটি ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিজে থেকেই লেখা হয়ে যায়। আপনাকে খুব বেশি সাজসজ্জা বা নাটকীয় রূপ দিতে হয় না।
অন্যান্য তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনের তুলনায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দীর্ঘ ও জটিল হয়। তাই, একে নির্দিষ্ট গঠন ও কাঠামোর মধ্যে নেওয়া হলে আপনার পাঠকদের জন্য জটিল বিষয় বুঝে নেওয়ার পথ তৈরি হয়। অনুসন্ধানী রিপোর্টের বহুল প্রচলিত তিনটি কাঠামো:

(ক) ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ফর্মুলার মধ্যে আছে:

  1. ১. একজন ব্যক্তি বা একটি পরিস্থিতি নিয়ে শুরু করে সেই কেইসের সাথে রিপোর্টের মূল বিষয়ের যোগসূত্র তৈরি।
  2. ২. একটি নাটগ্রাফ বা প্রতিবেদনের সারাংশের মাধ্যমে স্বতন্ত্র ঘটনা বা কেইস থেকে বৃহত্তর সমস্যার দিকে যাওয়া। এখানে নাট গ্রাফই ব্যক্তির সাথে বিষয়বস্তুর সংযোগ তৈরি করবে।
  3. ৩. যে ব্যাক্তির কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই ঘটনায় বা কেস স্টাডিতে ফেরা ও উপসংহার টানা।

(খ) ‘হাই ফাইভস’ পদ্ধতি তৈরি করেছেন লেখন-শৈলীর মার্কিন প্রশিক্ষক ক্যারল রিচ। তাঁর প্রস্তাব করা পাঁচটি বিভাগ:

  1. ১. মূল খবর (কী ঘটেছে বা ঘটছে)
  2. ২. প্রসঙ্গ (পটভূমি কী?)
  3. ৩. ব্যাপ্তি (এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, স্থানীয় প্রবণতা নাকি জাতীয় সমস্যা?)
  4. ৪. সীমা (এটি কোথায় নিয়ে চলছে?)
  5. ৫. প্রভাব (আপনার পাঠকরা কেন এটিতে গুরুত্ব দেবে?)

পাঁচটি বিষয় একত্রিত করতে এই কাঠামোতে রুপান্তরমূলক লেখায় পারদর্শী হওয়া প্রয়োজন। এটি না হলে, মনে হতে পারে পাঁচটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট একের পর এক আসছে। কিন্তু ওয়েবসাইটের দীর্ঘ রিপোর্টের জন্য এরকম কাঠামো হতে পারে। সেখানে দীর্ঘ বর্ণনাকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করা হয়, যেন পাঠকরা স্বচ্ছন্দে ধীরে ধীরে পড়তে (ব্রাউজ করতে) পারেন।

(গ) পিরামিড

নিরেট সংবাদ রিপোর্টের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি হলো ‘উল্টো পিরামিড কাঠামো’ (মূল বিষয়গুলো শুরুতে, পরে কম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সব বিষয়)। অপরদিকে অনুসন্ধানী রিপোর্ট পিরামিড কাঠামোর সঠিক দিকটি উপরে নিয়ে আসে। আপনার পুরো রিপোর্ট মূল বিষয়ের দিকে নিয়ে যাবে। আপনার উদঘাটন করা বিষয়গুলোর মধ্যে দিয়ে পাঠককে সেই মূল কথা বা উপসংহারে নিয়ে যেতে হবে।

  1. ১. রিপোর্টের মূলভাবের সংক্ষিপ্তসার দিয়ে শুরু করুন।
  2. ২. আপনি যা উদঘাটন করবেন তার কিছুটা পূর্বাভাস দিন।
  3. ৩. ধাপে ধাপে আপনার অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলুন, টেনশন জিইয়ে রাখুন এবং গল্পটিকে সবচেয়ে চমক দেওয়া বা নাটকীয় উদঘাটনের দিকে নিয়ে যান; ঠিক যেন কোনও বৈজ্ঞানিক সাফল্য অথবা রহস্য উপন্যাসের মতোই।
  4. ৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় তথ্যটি সবশেষে বলার জন্য তুলে রাখুন।

এই প্রতিটি সূত্র বা প্রণালীতে উপন্যাস রচনার কলা-কৌশল থেকে কিছু ধার নেওয়া হয়েছে। তাই, আপনি উপন্যাস সৃষ্টি না করলেও সাহিত্যের কিছু কৌশল প্রয়োগ করছেন। এটি সহজেই বোঝা যায় কারণ প্রতিটি সাংবাদিকই একজন কাহিনীরচয়িতা। শুধু ভালো নয়, সত্য কাহিনীর রচয়িতা হিসেবে নিজেকে দেখাই হলো সংবাদ লেখার আধুনিক পদ্ধতির ভিত্তি, যাকে আমরা বলি বর্ণনামূলক সাংবাদিকতা।

মার্কিনী গণমাধ্যমে ইরাক যুদ্ধের কাভারেজ নিয়ে “উইপনস অব মাস ডিসেপশন” নামে যে চলচ্চিত্রে এক ধরনের সতর্কবানী দিয়েছেন সে দেশেরই অনুসন্ধানী সাংবাদিক ড্যানি স্কেচটার। তিনি গল্পবলার এই কাঠামোর একটি বড় সমস্যা তুলে ধরেন: বর্ণনামূলক ধারায় ব্যক্তির একক গল্প বলতে গিয়ে, অনেক বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বিতর্ককে অগ্রাহ্য করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো। তবে, তার মানে এই নয় গল্প বলার বর্ণনামূলক ধারা খারাপ। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়, অন্য যেকোনো লেখার পদ্ধতির মতোই গল্পকথনের (স্টোরিটেলিং) ধরণও সঠিক প্রেক্ষাপটে, সচেতনভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বর্ণনামূলক সাংবাদিকতার কিছু কলা-কৌশলের মধ্যে আছে:

প্রতিকৃতি ও দৃশ্যায়ন: ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পদ্ধতিটি বেছে নিলে অনুসন্ধানের পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে সব খুঁটিনাটির ওপর আপনাকে গভীর নজর রাখতে হবে। অবশ্যই মূল উৎস বা দৃশ্যের বর্ণনা এমনভাবে দিতে হবে যেন পাঠকরা একে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে। এর অর্থ আবার এই নয় যে, সবকিছুর বিরক্তিকর বর্ণনা দেবেন (জায়গার সংকট তো আছেই), বরং বেছে বেছে কিছু জাজ্বল্যমান বিবরণ নির্বাচন করুন, যা আপনার রিপোর্টকে সমৃদ্ধ করবে।

ইঙ্গিত ও আভাস: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখার সময়, আপনার গল্পটি পাঠকদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে – এ সম্পর্কে শুরুতেই তাদের ইঙ্গিত বা ধারণা দেওয়াও গুরুত্বর্পূণ। বিশেষ করে আপনি যখন পিরামিড কাঠামো অনুসরণ করেন। গল্পের শেষে চূড়ান্ত সত্য উন্মোচনের আগ পর্যন্ত একটু একটু করে বিবরণ জানাতে থাকবেন, যাতে পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যায়।

গতি, কাঠামো ও শব্দ: লেখার ক্ষেত্রে গতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণনার প্রতিটি পর্যায়ে যেধরণের কাঠামো ও শব্দ আপনি বাছাই করেন তা-ই ঠিক করে দেয় আপনার রিপোর্ট কতটা দ্রুত বা ধীরে এগোবে। সংক্ষিপ্ত বাক্য ও শব্দ গতি বাড়ায়। দীর্ঘ বাক্য এর গতি কমিয়ে দেয়। বাক্য ছোট হলেও একটি নিরেট অনুচ্ছেদে বিপুল পরিমাণ কারিগরি তথ্য পাঠকদের ধীরে যেতে বাধ্য করবে। অপ্রয়োজনীয়, বাড়তি পটভূমি আপনাকে গল্প শেষ হওয়ার অনেক আগেই তার গতিরুদ্ধ করে দেবে। সবসময়ই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: এটি কী কোনো মূল্য আছে নাকি নিছক কিছু বাড়তি শব্দ যোগ করছে? রিপোর্টের জন্য প্রয়োজন নেই এমন কথা বাদ দিন।

নিজের রিপোর্টটি শব্দ করে পড়লে আপনি বর্ণনার গতি ও প্রবাহ বুঝতে পারবেন। আরও বুঝবেন গল্পটি কোথায় গিয়ে ধীর হয়ে গেছে, অথবা আরো খারাপ হলে, কোথায় একঘেঁয়ে মনে হচ্ছে। আপনার কানই সবচেয়ে ভালো সম্পাদক এবং এটিই আপনাকে বলবে কোথায় আপনি লেখক হিসেবে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন অথবা কোথায় আপনার ভাষা দীর্ঘসূত্রিতায় জড়িয়ে গেছে বা জটিল ও ভুল হয়েছে। রিপোর্টটি কথোপকথনের মতো করে লিখুন, যেন আপনি কাউকে গল্পটি বলছেন। এতে পাঠকরা আপনার কথার সুর বুঝতে পারবে। সঠিক ব্যাকরণ ও বিরামচিহ্ন লেখার মধ্যে সুর, শব্দের ওপর জোর ও সূক্ষ তারতম্য যোগ করে। কথা বলার সময় হাত, চোখ ও মুখের পেশী যে কাজ করে এগুলোও কাগজের ওপর সেই কাজটি করে।

ছবির মতো করে চিন্তা


বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় চিত্র ও নাটকীয় মুহূর্ত খুঁজে পাওয়ার একটি পদ্ধতি হলো ছবির মতো করে চিন্তা করা। বিন্যাস ও নকশা আপনার দায়িত্বের মধ্যে না পড়লেও চূড়ান্ত রিপোর্টের জন্য যেসব ছবি ও চিত্র প্রয়োজন হবে আপনি সেগুলো নিয়ে চিন্তা করুন। এমনকি অস্থায়ী শিরোনামও দিতে পারেন। এগুলো রিপোর্টের মূল ভাবনা বা ধারণায় আপনার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখা এবং সেই ধারণা অনুসরণ করা নিশ্চিত করে। আপনি যদি নির্দিষ্ট কিছু তথ্যের তালিকা পরিকল্পনা করেন তবে সেটি আপনাকে রিপোর্টের বিরক্তিকর একই বিষয়গুলোর পুণরাবৃত্তি করতে দেবে না। এছাড়া, ছবির মতো করে চিন্তা আপনার চূড়ান্ত রিপোর্টকে অন্যভাবেও সহায়তা করতে পারে:

  • > সম্পাদক বা বার্তা বিভাগের কাছে অনুসন্ধানের প্রস্তাব তুলে ধরতে সহায়তা করে; কেননা, আপনি আগেই জানেন তাতে কোন ধরণের মানচিত্র, ছক, গ্রাফ ও ছবির প্রয়োজন হতে পারে।
  • > দলগতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হয়, কেননা, পাতা বিন্যাসের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কাজ সহজ হয়।
  • > রিপোর্টটির জন্য সবচেয়ে ভালো ছবি কোনটি হবে এবং কোথায় আপনি ফটোগ্রাফির সহকর্মীদের সহায়তা নিতে পারেন সেই আলোচনা এবং দলগতভাবে কাজ করা এতে সহজ হয়।
  • > এটি আপনার মাথায় ছবি তৈরি করে দেয়, শব্দ দিয়ে যে চিত্রটি আপনি ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
  • > সঠিকভাবে বাছাইকৃত ছবি ও আকর্ষণীয় চার্টের মাধ্যমে পাঠকের কাছে লেখার চেয়ে বেশি ভালোভাবে বার্তা পৌঁছায়। প্রবাদ আছে, একটি ছবি হাজারো শব্দের সমান।

সম্পর্ক ও সমাপ্তি


প্রতিটি রিপোর্টের শুরু ও শেষটা ভালো হওয়া উচিত। যেকোনো লেখার শুরু ও শেষ অংশগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। সুন্দর সূচনা পাঠকদের টেনে নেয় এবং পুরো রিপোর্টটি পড়ে দেখার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। অধিকাংশ গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিষয় যতোই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, শুরুটা আকর্ষণীয় না হলে পাঠকরা আর এগোয় না। একইভাবে শেষটা হলো এমন এক ধারণা, যা পাঠক রিপোর্ট শেষে মনে রাখে।
শুরু করার পদ্ধতিগুলোর মধ্যে আছে:

  • একটি সূচনামূলক দৃশ্য তুলে ধরা
  • একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে রিপোর্টের মূলভাবের সারাংশ (পুরো রিপোর্ট নয়)
  • এর ফলাফল বা প্রভাব। এরপর আপনি পেছন ফিরে বলতে পারেন এটি কীভাবে ঘটেছে।

সব ক্ষেত্রেই, রিপোর্টটি কী নিয়ে সেটি বলতে পাঠককে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করাবেন না। প্রচলিত একটি ভালো নিয়ম হলো সূচনায় কখনো রিপোর্টের ১০ শতাংশের বেশি রাখা উচিত নয়। কিন্তু এটিকে পাঠ্য বইয়ের ভাষায় ‘বিলম্বিত সূচনা’ হিসেবেও ভাববেন না। আপনার রিপোর্টের সূচনা হবে যেখানে এটি শুরু হয়েছে। আর এজন্য ঘটনা বা তথ্যসমূহের দীর্ঘ তালিকা অপ্রয়োজনীয়। রিপোর্টের শেষে এসেও আপনাকে একইভাবে কাজ করতে হবে। সন্তোষজনক সমাপ্তির মধ্যে আছে:

  • আলগা প্রান্তগুলোকে বেঁধে ফেলা (চরিত্রগুলোর কী ঘটেছে বা আগামীতে কী ঘটতে যাচ্ছে)
  • আমরা কেন আগ্রহী তা বোঝাতে রিপোর্টের মূলভাবের সারাংশ আরেকবার বলা
  • শিরোনামের মত একটি আকর্ষণীয় সমাপণী বক্তব্য (কিকার) তৈরি করুন (যা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে)
  • পটভূমির ওপর জোর দিন। বিষয়টিকে আবার তার নিজের অবস্থানে নিয়ে যান এবং ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা এবং এ নিয়ে আশা-সীমাবদ্ধতার কথা পাঠককে জানান।
  • চলে যান শুরুতেই সাক্ষাৎ হওয়া লোকজনের কাছে এবং তাদেরকেই সমাপ্তি টানতে দিন।
  • শুধুমাত্র সম্পূর্ণতার জন্য সমাপ্তি টানবেন না। আর ভিন্ন শব্দেও কখনো পাঠককে বলবেন না ‘শুধু সময়ই বলে দেবে’। আপনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, তাই কোনো নির্দিষ্ট সমাধান ছাড়া সমাপ্তি টানলে আপনার ওপর পাঠকের আস্থা কমে যাবে।

আপনার রিপোর্টের গাঁথুনি জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ: যেভাবে গল্প এক অংশ থেকে আরেক অংশে এবং এক অনুচ্ছেদ থেকে আরেক অনুচ্ছেদে যায়। একই রকম হবে এমন বর্ণনামূলক রিপোর্ট তৈরির সবচেয়ে দরকারি কৌশল হলো:

  • বিষয়বস্তু বার বার উল্লেখ করা।
  • ধারণাগুলোকে জোটবদ্ধ ও স্পষ্ট রাখতে বেশি করে উপমা ব্যবহার। উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশকে আপনি মানুষের শরীরের সঙ্গে তুলনা করে বলতে পারেন শরীরের সব অংশকে যেমন একসঙ্গে কাজ করতে হয়, পরিবেশও সেভাবেই কাজ করে।
  • ছবি, কোনো বস্তু, প্রবাদ বা আপনার অনুসন্ধানের সঙ্গে খাপ খায় এমন কিছু এমনভাবে ব্যবহার করুন যেন তা রিপোর্টকে বেঁধে রাখার সুতার মতো কাজ করে।

জটিল যুক্তিতর্কের ক্ষেত্রে কতগুলো সহজ কথা পাঠককে আপনার সঙ্গে রাখার জন্য অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করতে পারে। আগের অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় কোনো অনুচ্ছেদ (‘এবং’), পথ পরিবর্তন হলে (‘কিন্তু’), ফলাফল হলে (‘তাই’), অনুসরণ হলে (‘এরপর’) এমন নির্দেশক শব্দ বেশি ব্যবহার করুন।

প্রাথমিক খসড়াটি আপনার নিখুঁত রিপোর্ট হওয়ার কথা নয়, বরং এটি হবে দীর্ঘ। তাই চূড়ান্ত করার সময় অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে রিপোর্টের জন্য পূর্বের সংগৃহীত তথ্য এখনো প্রযোজ্য কিনা এবং পরে পাওয়া কোনো তথ্যের সঙ্গে তা বিরোধপূর্ণ কিনা- তা যাচাই করা। একইভাবে নতুন তথ্য, বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট বা পরীক্ষার ফলাফলও আসতে পারে। ইন্টারনেটে আবারও অনুসন্ধান চালানো ভালো। প্রতিবেদনটি সম্পাদনার সময় হয়তো কিছু অংশকে অতিরিক্ত বোঝা বলে মনে হতে পারে। এগুলোকে আপনি রিপোর্ট থেকে টেনে কোনো বক্স বা সাইডবারে নিতে পারেন । তবে সেরা রিপোর্টগুলোর খসড়া সাধারণত একাধিকবার করা হয়। আপনার লেখা সম্পাদনা কোনো বাড়তি বিলাসিতা বা মূল্যহীন কাজ নয়। বরং এটি আপনার সাধ্যমত সবচেয়ে ভালো রিপোর্ট লেখার পদ্ধতির একটি অংশ। একাকী বারবার খসড়া ও সম্পাদনা কষ্টকর হয়ে পড়লে সম্পাদনা ও সংশোধনের কাজের জন্য একজন সহকর্মী বা দলের সদস্যকে খুঁজে নিন। দলগত কাজ থেকেই ভালো ধারণা আসে।

সম্প্রচারের জন্য কীভাবে লিখবেন?


দ্রষ্টব্য: এটি সম্প্রচারের জন্য লেখার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা নয়। তবে, এতে সম্প্রচারের জন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কীধরণের ভাষা ব্যবহার এবং ভালো ধারাবর্ণনা কীভাবে তৈরি করতে হবে সে বিষয়ে কিছু আভাস দেওয়া হয়েছে।


সব সম্প্রচার প্রতিবেদনেই ভিডিও ফুটেজ বা অডিও উদ্ধৃতি থাকে। একই ছবি ও উদ্ধৃতি পটভূমিভেদে অনেকধরণের গল্প বলতে পারে। পারিপার্শ্বিক ভাষ্যের লক্ষ্য হলো আপনার গল্পটি শ্রোতাদের বুঝতে পারার বিষয়টি নিশ্চিত করা। একটি বুদ্ধিদীপ্ত লেখা খুবই সাধারণ কোনো ছবি বা গতানুগতিক উদ্ধৃতিকে নতুন আলোকে দর্শকদের কাছে হাজির করতে পারে। রেডিওতে ধারণকৃত বক্তব্যের আলোকে স্ক্রিপ্ট লেখা হলে সেটি হয় সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু টেলিভিশনের ক্ষেত্রে রিপোর্টেও প্রভাবের ৮৫ শতাংশ নির্ভর করে ছবির ওপর। বিরক্তিকর ছবি ও উদ্ধৃতির সমস্যা ভালো লেখায়ও দূর হয় না। এর মাধ্যমে দর্শক ‘ধরা’ যায় না এবং তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। উভয় ক্ষেত্রেই ছবি বা রেকর্ড করা উদ্ধৃতিকে কেন্দ্র করে আপনার গল্প সাজাতে হবে। এই বিষয়কে বলা হয় ‘কানের জন্য লেখা’, ‘ছবির জন্য লেখা’, অথবা ‘শব্দের জন্য লেখা’।

ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এমন কিছু ঘটনাস্থলের খবর বা ‘গ্রাউন্ড রিপোর্ট’ দিয়ে আপনি শুরু করুন। এরপর আপনার নিজস্ব মন্তব্যে সাবধানে নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করুন এবং পরের ধাপে অগ্রসর হোন:

  1. (১) রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোয় জোর দিন
  2. (২) ছবি ও উদ্ধৃতি যেখানে শুধুমাত্র কয়েকটি দিক তুলে ধরছে সেরকম অবস্থায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করুন
  3. (৩) যে বিষয়গুলোতে আপনি দর্শকদের মনোযোগী করতে চান সেগুলো নির্বাচন করে তার ওপর জোর দিন
  4. (৪) বিভিন্ন চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো সংযুক্ত করুন এবং সময়ের সঙ্গে এগুলো কীভাবে বদলেছে তা ব্যাখ্যা করুন
  5. (৫) চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো প্রাসঙ্গিক করুন
  6. (৬) চিত্র বা উদ্ধৃতিগুলোর যে ব্যাখ্যা বা অর্থ বোঝাতে চান সেগুলো যোগ করুন (তবে তথ্য বিকৃত করবেন না বা বাদ দেবেন না!)

উপস্থাপক বা রিপোর্টাররা এসব বিষয় মেনে চলতে পারেন এবং এগুলো মানা উচিত। তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি সবসময়ই দর্শক ও সংবাদের মাঝখানে ফিল্টারের মতো থাকবেন বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। আপনার রিপোর্টে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হলে স্টেশনের নিজস্ব কন্ঠ ব্যবহার বা নিজস্ব ভাষায় প্রচারের চেয়ে সেই ব্যাক্তির কন্ঠকেই সবসময়ে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

সম্প্রচার মাধ্যম ও ছাপা প্রকাশনার মধ্যেকার পার্থক্য:

ছাপা প্রকাশনা সম্প্রচার মাধ্যম
পত্রিকায় পাঠকরা যখন কিছু পড়েন সেটি না বুঝলে তিনি পেছন ফিরে গিয়ে আবার পড়তে পারেন। সম্প্রচারিত সংবাদগুলো একবারই মাত্র দর্শকের সামনে দিয়ে চলে যায়। এ কারণে দর্শকদের মধ্যে বিস্তারিত মনে রাখার চেয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। সম্প্রচারিত সংবাদে পুরো প্যাকেজের ধরণ সেকারণেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ার সময় ভুলগুলো চোখে পড়ে এবং পাতাতেই থেকে যায়। সম্প্রচার মাধ্যমে দর্শকরা প্রথমবারেই ভুলটি ধরতে পারেন অথবা কখনোই তারা ভুল ধরতে পারেন না।
পাতা ধরে পড়ার পড়ার সুবিধার্থে সেখানে শিরোনাম, ক্যাপশন ও অনুচ্ছেদের মতো চিহ্নগুলো স্পষ্টভাবেই থাকে। সম্প্রচারের মাঝামাঝি দেখতে এসে সেখানে কী চলছে তা বোঝা নতুন দর্শকদের জন্য বেশ কষ্টকর।
পাঠকরা পড়া বন্ধ রেখে চলে যেতে পারেন এবং অন্য কিছু করতে পারেন। আবার যখন তারা ফিরে আসবেন কোনো কিছু না হারিয়ে যেখানে পড়া থামিয়েছিলেন সেখান থেকেই আবার শুরু করতে পারেন। রেকর্ড করা না হলে বা ইন্টারনেটে না পাওয়া গেলে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে দেখা থামিয়ে দিয়ে, অন্য কাজ করা সম্ভব নয়।
ছবি ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিবেদনের বিশ^াসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। অনলাইন প্রকাশনা তাদের আস্থা বাড়াতে এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে। সম্প্রচারিত সংবাদে বক্তব্যের পক্ষে দর্শকদের আরও বেশি প্রমাণ দেওয়া হয় (উদাহরণ: শব্দ, ছবি), যা একে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে (এমনও শোনা যায়, ‘এটি অবশ্যই সত্য: আমি টিভিতে দেখেছি’)। একই কারণে, এটি সত্যকে আরও জোরালোভাবে বিকৃত করতে পারে।
পড়তে বেশি সময় লাগলেও লিখিত রিপোর্ট থেকে পাঠক অনেক বেশি বিস্তারিত তথ্য পেতে পারেন। সম্প্রচারিত সংবাদের জন্য উচ্চ-শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বৈচিত্রময় দ্রুত চলা প্যাকেজ বোঝার জন্য ভালো সাধারণ জ্ঞান প্রয়োজন।

পডকাস্ট ব্যতীত সম্প্রচারিত সংবাদ শুধুমাত্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে। এখানে পত্রিকার মতো বস্তুগত কোনো বিষয় থাকে না।

এসব কারণে সম্প্রচারিত সংবাদ এবং দর্শকদের এগুলো গ্রহণ করার ধরণ থেকে বোঝা যায়, সম্প্রচারের জন্য যে ভাষায় আগাতে হয় সেটি প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যবহৃত ভাষা থেকে ভিন্ন। অবশ্য মাধ্যম যাই হোক না কেন, সংক্ষিপ্ত সময় ও জায়গার মধ্যে আপনাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ বা আকর্ষণীয় তথ্য’ অথবা ধারণা খুঁজে নিন যা দ্রুততম সময়ে আপনার দর্শকদের ধরতে পারবে। আর এটি ব্যবহার করুন আপনার অনুসন্ধানী প্যাকেজের শুরুতেই।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে বাসা থেকে কলেজছাত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

সিলেট থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু ?

উত্তরাঞ্চল সফর হলো না, তারেক রহমানের নির্বাচনী সফর সিলেট থেকেই শুরু?

ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি কে?

জকসু নির্বাচন : কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬৫ শতাংশ

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ প্রশ্ন করুন

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে পাবেন ভেতরের খবর

গবেষণা, গবেষণা, গবেষণা

তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষার কৌশল

১০

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?

১১

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের খবরের সন্ধান

১২

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে হবেন

১৩

জমে উঠেছে জকসু নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর হিড়িক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা

১৪

বিজ্ঞপ্তির ১ ঘণ্টা পরও ফল দেখতে পারছেন না জবির ভর্তিচ্ছুরা, ডিন বললেন- ‘ভুলে হয়েছে’

১৫

প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রিপোর্টে হাতে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

১৬

বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন

১৭

আপিলের প্রথম দিনে যে ৪২ আসনের আবেদন জমা পড়ল

১৮

চাঁদাবাজির মামলায় জামিন মুক্তি পেয়েছেন ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী

১৯

সারাদেশে শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর অভিযান

২০