রবিবার , ১১ জানুয়ারী ২০২৬
studentnewsbd
৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১:৪১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ প্রশ্ন করুন

অধ্যায় সাতযথাযথ প্রশ্ন করুন

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে সাক্ষাৎকার। কিন্তু, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটু বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়; খবরের বিষয় এবং সূত্রগুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সবকিছু জানতে আগেই খোঁজ-খবর করে নিতে হয়। তাহলেই কেবল আপনি যুৎসই প্রশ্নগুলো করতে পারবেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হতে পারে স্পর্শকাতর, তা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে এবং তাতে কারো সুনামও নষ্ট হতে পারে। আবার, এগুলোর সবই একযোগে হতে পারে। এ কারণেই সাক্ষাৎকারের দক্ষতা শানিয়ে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি ছক করে নিতে পারেন কী ধরনের প্রশ্ন করবেন এবং কোন প্রশ্ন আগে ও কোন প্রশ্ন পরে করবেন। তাছাড়া, সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় কিছু নৈতিক বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সাক্ষাৎকারের জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নেবেন?


যোগাযোগ স্থাপনের অন্য সব কাজের মতোই সাক্ষাৎকারও একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। সাক্ষাৎকারের ফলাফল কেমন হবে, তা সাক্ষাৎকারদাতার ওপরে যতটা নির্ভর করে, ঠিক ততটাই নির্ভর করে আপনার ওপর। ভালো সাক্ষাৎকারে একটি আলাপচারিতার আবেশ থাকে। একই সাথে এটি আপনার কাক্সিক্ষত উত্তরগুলো বের করে আনার একটি পরিকল্পিত কৌশলেরও অংশ।

সাক্ষাৎকার নেয়ার আগে, আপনাকে খবরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে হবে এবং তার সঙ্গে সূত্রের যোগসূত্র বুঝে নিতে হবে। এটি করার জন্য আপনাকে সেসব লেখা ও নথিপত্র ঘেঁটে দেখতে হবে, যেখানে আপনার অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপট ও পূর্ব-পরম্পরা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। বিপরীতে, এটি আপনাকে উপযুক্ত প্রশ্নমালা তৈরি ও সেগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা পেতে আপনাকে সাহায্য করবে। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা করুন। তা না হলে, আপনি গুটিকয়েক মানুষ বা সূত্রের ওপরে নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন, যারা হয়তো ঘটনা বা ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরের চরিত্র। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আপনি এমন কোনো স্থানে গেলেন যেখানে খামারকর্মী, শিল্পশ্রমিক বা এ জাতীয় পেশার লোকজন কাজ করেন। সেখানে সহজেই দেখতে পাবেন, কর্মীরা নিয়োগদাতার হাতে কতটা ভুক্তভোগী। কিন্তু আপনি যখন কোনো বড় শহরের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) কার্যালয়ে যাবেন, তখন এটা সাধারণ চোখে ধরা পড়বে না। তাই আপনি সরেজমিনে যা দেখছেন, আর কাগজে কলমে লেখা নীতিমালা বা বাজেটে ওই বিষয়ে যা পাচ্ছেন, তার মধ্যে তুলনা করুন ও মিল-অমিল যাচাই করুন। অন্যান্য জায়গা বা বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ঘটনায় যা ঘটেছে, তার সঙ্গে আপনার অনুসন্ধানের তুলনা করে নিন। অগ্রিম এই প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে আপনি প্রাসঙ্গিক সব প্রশ্ন করতে সক্ষম হবেন এবং আপনার প্রতিবেদনের জন্য দরকারী তথ্যগুলো বের করে আনতে পারবেন।

মানুষকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেয়া


আপনার প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে, যার বলার মতো কাহিনী আছে, এরকম ব্যাক্তির অফিসে আপনি হঠাৎ করে ঢুকে গিয়ে (যদিও মানুষ অনেক সময় এটাকে ভালোভাবে নেয় না) অথবা ফোন করে সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। আপনি হয়তো এমন একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন, যার সঙ্গে দেখা করার পথে বারবার বাধা আসছে। এমন হলে, আপনি সেই ব্যক্তির গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারেন। তাঁর অফিসের বিশ্রাম কক্ষ বা লবি, অথবা উন্মুক্ত কোনো অনুষ্ঠান যেখানে সেই ব্যক্তির উপস্থিত হওয়ার কথা আছে – সেসব জায়গায় গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে পারেন। অবশ্য, এই কৌশলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। একটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ: এমন কোনো আচরণ করবেন না, যাতে মনে হয় আপনি তাদের জন্য ওঁৎ পেতে আছেন। আপনাকে অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে নিজের পরিচয় দিতে হবে। জানাতে হবে যে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে আপনি খুশি হবেন। সন্দেহ তৈরির আশঙ্কা থাকলে আপনি একজন মধ্যস্থতাকারীর কথা ভাবতে পারেন। ওই ব্যক্তির চেনা-জানা গন্ডির মধ্যে সেই মধ্যস্থতাকারী হবেন একজন ‘দ্বার-উন্মোচক’। কোনো কোম্পানি, সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সহযোগী কোনো প্রতিষ্ঠানের কারও সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে আপনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রেস অফিসের মাধ্যমে অনুরোধ করতে হবে। সকল ক্ষেত্রেই আপনাকে নম্র আচরণ করতে হবে।

একটা কৌশল কাজে দিতে পারে। কাউকে ফোন করা বা সরাসরি সাক্ষাৎ করার আগে খুবই সংক্ষিপ্ত একটা মহড়া করে নিন। তাতে থাকবে আপনার সাক্ষাৎকারের প্রধান প্রধান পয়েন্ট সংবলিত একটা সূচনা বক্তব্য। এই পর্যায়ে আপনাকে একটা বিষয় ভাবতে হবে। সেটা হচ্ছে, সাক্ষাৎকারদাতার কাছে আপনি কখন প্রকাশ করবেন যে আপনি একজন সাংবাদিক। কোন পরিস্থিতিতে আপনি আপনার পেশাগত পরিচয় গোপন করে অন্য কোনো পরিচয় দেবেন (যেমন, বিক্রয় প্রতিনিধি)? কীভাবে আপনি সেই ‘ভূমিকা’কে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবেন?

আপনি হয়তো কারো সঙ্গে প্রথমবারের মত অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখা করলেন, যাঁর সঙ্গে ভবিষ্যতেও কথা বলতে হতে পারে। তাই, তাঁকে কীভাবে একটা সূত্রে পরিণত করা যাবে, সেই চিন্তা নিয়ে কাজ করুন। পরিকল্পনার ছক এঁেক নিন। আলাপে যেসব ইস্যু আসতে পারে, তা ঠিক করে নিন। সেই ব্যক্তির আগ্রহের বিষয়গুলো জেনে নিতে পারেন। তাঁর কর্মস্থলে যেসব ইস্যু আছে, সেগুলো সম্পর্কে তাঁকে আলোচনা করতে কীভাবে উৎসাহিত করা যাবে? একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে আপনার নিজেকে উপস্থাপনা যেমন হবে, তার চেয়ে পানশালার একজন কর্মীর সঙ্গে আচরণ কী আলাদা হবে? হলে সেটা কীভাবে? যেসব ব্যক্তি দৃশ্যত রুটিন কাজ করেন, কখনোই তাঁদের বুদ্ধিমত্তাকে খাটো করে দেখবেন না! এর জন্যে কতটা সময় লাগতে পারে সে বিষয়ে স্পষ্ট ও বাস্তববাদী হোন। সরকারের একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে ১৫ মিনিট হবে খুবই লম্বা সময়। কিন্তু, মানসিক আঘাত পেয়েছেন, এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে খোলামেলা উত্তর পেতে হয়তো পুরো একটা দিনই লেগে যেতে পারে।

কোনো সূত্র আপনাকে আগেভাগেই প্রশ্নমালা পাঠাতে বললে, আপনাকে হয়তো তাই করতে হবে। কিন্তু সাধারণত একে ভালো চর্চা বলে মনে করা হয় না। সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তুর ওপর একটা মোটামুটি রূপরেখা পাঠালে হয় কি না, সেই চেষ্টাও করে দেখতে পারেন। বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তি ছাড়া অন্যদের কাছে আগেভাগে প্রশ্নমালা পাঠালে তা একটা বাগাড়ম্বরপূর্ণ, কৃত্রিম সাক্ষাৎকারে পরিণত হতে পারে। কখনো কখনো তথ্য জোগাড় করার জন্য বিশেষজ্ঞদের সময় দরকার হয়। তাই জানিয়ে রাখুন, ফলো-আপের জন্য তার কাছে আবারও আসতে হতে পারে।

আবার এমনও হতে পারে, কোনো সূত্র আপনার সঙ্গে দেখা-ই করতে চান না, শুধু একটা লিখিত বিবৃতি দিতে চান। এ ক্ষেত্রে আপনাকে সম্পাদকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং প্রতিবেদনে তা ব্যবহারের উপযুক্ত উপায় কী হবে, তা ঠিক করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আদর্শ ব্যাখ্যাটি হবে এরকম: ‘আমরা সাক্ষাৎকারের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কাউকেই পাওয়া যায়নি। অবশ্য, আমাদের কাছে ফ্যাক্সের মাধ্যমে একটা বিবৃতি পাঠানো হয়েছে।’ এরপর বিবৃতিটি পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে হবে।

কোনো সূত্র কথা বলতে রাজি হলে, আপনার প্রথম কাজ হবে উপযুক্ত জায়গা বাছাই করা। নিজ বাড়ি বা অফিসে সাক্ষাৎকারদাতা কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। নিজের এলাকা বলেই, তিনি একটু সহজ হতে পারেন। তবে তা আপনাকেও তাঁর প্রেক্ষাপট দেখার সুযোগ দেবে। আপনার অফিস আপনাকে মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা দেবে, কিন্তু অচেনা মানুষজনের মধ্যে তিনি নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারেন। সাক্ষাৎকারের ধরন সম্পর্কে চিন্তা করে নিন। প্রকাশ্য নাকি গোপন – ভেবে নিন কোন ধরনের জায়গায় কথা বললে বেশি সফলতা আসবে। পারিপার্শ্বিক শব্দদূষণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে, যা হয়তো কথোপকথন রেকর্ডে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে, ফোনকল, ইমেইল বা ফ্যাক্সের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করে নিন, যাতে সাক্ষাৎকারদাতা বলতে না পারেন যে তিনি ‘ভুলেই গিয়েছিলেন’। ব্যক্তিগত সহকারি কবে সেই ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করবেন – তার জন্য অপেক্ষা করবেন না। সাড়া দেওয়ার একটি যৌক্তিক সময় বেঁধে দিন। পরে আবার ফোন করুন। অটল থাকুন। তবে তা যেন উপদ্রব না হয়ে যায়।

আগেই ঠিক করুন কোন কোন প্রশ্ন করবেন


আপনার সাক্ষাৎকারের কাঠামো এমনভাবে সাজিয়ে নিন, যাতে সেটা যদি সফল নাও হয়, তবু আপনি যেন এমন কিছু তথ্য উদ্ধার করতে পাবেন যা আপনার কাজে লাগবে।

  1. ১. ওয়ার্ম আপ (পরস্পরের মধ্যে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করা)
  2. ২. মৌলিক তথ্য, যাতে অন্তর্ভূক্ত থাকবে জানা বিষয়গুলো নিশ্চিত করা
  3. ৩. ‘নমনীয়’ প্রশ্নমালা
  4. ৪. ‘শক্ত’ প্রশ্নমালা

খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সোর্সকে কথা বলায় সাচ্ছন্দ্য করতে কতটা সময় লাগবে, সে বিষয়ে একটা আন্দাজ করে নিন। তবে, সাক্ষাৎকারের প্রাথমিক ধাপগুলো , সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মেনে সৌজন্য প্রদর্শনসাপেক্ষে, সংক্ষিপ্ত ও হালকা রাখার চেষ্টা করুন। এরপর যত দ্রুত সম্ভব মূল বিষয়ে প্রবেশের চেষ্টা করুন। আপনার সাক্ষাৎকারে একটা যৌক্তিক কাঠামো নিশ্চিত করুন। প্রথমে সেসব প্রশ্ন করুন যাতে আপনার দরকারি তথ্যগুলো বেরিয়ে আসে। তুলনামূলক চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নগুলো পরে করুন। আপনার প্রশ্নগুলো অবশ্যই সহজে বোধগম্য, পরিস্কার ও যথাযথ হতে হবে। একটা দীর্ঘ ও জটিল এলোমেলো প্রশ্নের চেয়ে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ছোট ছোট কয়েকটি প্রশ্ন অনেক ভালো। কারণ, দীর্ঘ প্রশ্নে আপনার সূত্রটি খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। এসব প্রশ্ন আগেভাগেই আপনার মাথায় সাজিয়ে নিন।

কিছু পরামর্শ:

  • একই প্রশ্নে অনেক উত্তর চাওয়ার প্রবণতা এড়িয়ে চলুন: ‘মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কি টেন্ডারে অনিয়মের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন, আপনি কী এই প্রক্রিয়ার তত্বাবধানে ছিলেন এবং কেন তেমনটি করলেন এবং চুক্তিটি করলেন?’ এমন প্রশ্ন করলে আপনার সূত্রটি শুধু প্রশ্নের সেই অংশটিরই উত্তর দেবেন, যেটি তিনি আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
  • দ্বৈত নেতিবাচক প্রশ্ন এড়িয়ে চলুন। কারণ এমন বিষয় অযাচিত সংশয় সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘এটা কী সত্য নয় যে আপনি ওই্ অর্থ ফেরত দেননি?’ এমন প্রশ্নে সেই অর্থ সম্পর্কে দুটি উত্তরের একটা আসতে পারে। অথবা সেই বিবৃতির কেবলই সত্যতা সম্পর্কে উত্তর আসতে পারে। ‘এটা কী সত্য যে আপনি ওই্ অর্থ ফেরত দেননি?’ এটা হবে অধিকতর সহজ ও স্পষ্ট; ‘আপনি কী ওই্ অর্থ ফেরত দিয়েছেন?’ এটা হবে আরও ভালো প্রশ্ন।
  • যেগুলো শুধু নিশ্চিত করা প্রয়োজন তেমন প্রশ্নগুলো যুক্ত করুন। এগুলো এমন প্রশ্ন যার উত্তর আপনি জানেন। এটা মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। আর এর মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন, আপনার সূত্র সঠিক তথ্য দিচ্ছে কিনা। সাক্ষাৎকারদাতা যদি প্রশ্নের সাদামাটা ভাব দেখে বিভ্রান্ত হন, তবুও আপনি কিছু মনে করবেন না। যদিও দরকার হয় না, তবু আপনি বিষয়টির ব্যাখ্যায় বলতে পারেন: ‘পাঠক এই উত্তরটি আপনার মুখ থেকে শুনতে চান, আমার মুখ থেকে নয়।’ বদ্ধ প্রশ্ন (অন্য ভাষায়, যার উত্তর আসে হ্যাঁ, না বা এমন এক শব্দে)-এর সঙ্গে ফারাকের বিষয়টি মাথায় রাখুন।
  • উন্মুক্ত প্রশ্ন করুন। এই প্রশ্নগুলোতে আপনার সোর্স তাদের ধারণা সম্পর্কে আরো খোলামেলা কথা বলতে আগ্রহী হবে। উন্মুক্ত প্রশ্নগুলো আপনার সামনে একটি ভাষ্য হাজির করে। অন্যদিকে বদ্ধ প্রশ্ন আপনার প্রতিবেদনের নির্ভুল তথ্য হাজির করে। এই দুইয়ের মিশেল ব্যবহার করুন।

সাক্ষাৎকারের সময় আচরণ


সাংবাদিকেরা প্রায়ই বাজে আচরণের জন্য সমালোচিত হন। বলা হয়ে থাকে – তাঁরা অতি উৎসাহী; অনেক সময় ঘটনার উত্তেজনায় ঘি ঢালেন, মানুষের সুনাম নষ্ট করেন; বিরোধীদের পক্ষে কাজ করেন; কঠোর উদ্যমী লোকজনের কাজে ব্যাঘাত ঘটান; অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতায় ঘাটতি থাকে; এ ধরনের অনেক অভিযোগ তাদের নামে। মাঝেমধ্যে, অভিযোগে সত্যতাও থাকে। এ ধরনের নেতিবাচক ধারণা কাটাতে শালীন ও নৈতিক আচরণ করতে হবে। আপনার কখনোই রূঢ় হওয়া চলবে না; এমন কিছু দাবি করবেন না, যা অযৌক্তিক। আপনি যদি এমন ভাব দেখাতে থাকেন যাতে মনে হয় সব তথ্যের ওপর শুধু আপনারই অধিকার; তাহলে সোর্স ও সমাজের অন্যান্য জায়গা থেকে আপনার প্রতি বৈরিতা বাড়বে।

বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন যে তাঁরা ভালো ও সৎ। সুতরাং, সুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আপনি তাকেই কেন ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করবেন না? কয়েকটি উপায়ে প্রশ্ন সাজানো গেলে, তা প্রায়ই ভালো ফল বয়ে আনবে। যেমন, ‘এটা কীভাবে ঘটে, তা জানতে পারলে আমি সত্যিই খুশি হব’, অথবা ‘কমিউনিটির সুবিধার জন্যই দয়া করে এই বিষয়টা যদি ব্যাখ্যা করতেন’; এই ধরনের কথাবার্তায় প্রায়ই ইতিবাচক ফলাফল দেখা যায়। তথ্যটা যে জনস্বার্থে প্রকাশ হওয়া জরুরি, তা বোঝাতে পারলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তথ্যদাতারা সাংবাদিকদের সহযোগিতা করেন।

এটা শুধুই একটা কৌশলের বিষয় নয়; ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ বলে একটা বাহারি তকমা আছে সাংবাদিকদের, কিন্তু এটাও সত্য যে সরকারি কর্মকর্তা বা জনসেবকদের কর্মকান্ড তদারকরি জন্য কোনো সাংবাদিকই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন না। সাংবাদিকেরা হচ্ছেন নাগরিক সমাজের অংশ। সেই বিবেচনায় রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করছে কিনা তা নিশ্চিত করার নাগরিক দায় তাঁরা পালন করেন। এই অবস্থায়, সাংবাদিকদের রয়েছে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের মতো গণযোগাযোগের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশাধিকারের সুবিধা। সাংবাদিকেরা অনেক সময় বৈরি প্রতিষ্ঠান বা দূর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য গোপন রেকর্ডার ব্যবহারের মতো পদ্ধতির সাহায্য নেন, যাতে এমনকি আইন লঙ্ঘনও হতে পারে। সেকারণেই সন্তোষজনক, আন্তরিকতাপূর্ণ ও স্বচ্ছ (অন্তত যতটা সম্ভব স্বচ্ছ) পদ্ধতি ব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন সাংবাদিক হিসেবে আপনি যেন আপনার দায়িত্বের সীমা লংঘন না করে ফেলেন, সে জন্য সব সময় এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করবেন: যাকে নিয়ে অনুসন্ধান করছি, সেই ব্যক্তি আমি হলে বিষয়টাকে কীভাবে দেখতাম? আমি সাংবাদিকদের ভূমিকাকে কীভাবে দেখি? আমার নিজের জবাবদিহিতা কতটা? আমি যে অন্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছি, এমন প্রলোভন থাকলে আমি কী আত্মসমর্পণ করতাম? কী আমাকে নিবৃত্ত করতো? আমার জবাবদিহি (‘চেক অ্যান্ড ব্যাল্যান্স’) কোথায়?

সাক্ষাৎকারের মৌলিক নীতিমালা


সময়মতো পৌঁছানো

আপনি দেরিতে পৌঁছালে সূত্রের সঙ্গে আপনার দূরত্ব তৈরি হবে। আপনার নিজের সময় নষ্ট হবে, ক্ষমা চাওয়ার জন্য সময় ব্যয় হবে এবং সাক্ষাৎকারের শুরুতে হয়তো আপনার দম থাকবে না; হাঁপাতে হাঁপাতে মূল বিষয়ে মনোযোগ রাখা সম্ভব হবে না।

উপযুক্ত পোশাক পরিধান করুন

পোশাক পরিধানের নিয়মনীতি এখানে যথেষ্ট শিথিল হলেও প্রথম দর্শনেই আপনার সম্পর্কে সূত্রের একটা খারাপ ধারণা হোক, তা নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন না। প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিল রেখে পোশাক পরতে পারেন। উপযুক্ত শ্রদ্ধা দেখাবেন। পোশাকে আপনার জীবনাচারণ বা মতাদর্শ সম্পর্কে যেন কোনো বার্তা না থাকে।

কোথায় বসবেন, ঠিক করুন

আপনার এমন একটা স্থানে বসা দরকার, যেখান থেকে চোখাচোখি ভালো হবে এবং সেরকম জায়গা বেছে নিতে প্রয়োজনে আপনার রেকর্ডিং ডিভাইসকে একটা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন (যেমন, এটা এই স্থানে রাখলে অধিকতর ভালোভাবে রেকর্ড হবে…)। আবার, একেবারে মুখোমুখি বসলে দুজন দ্বন্দ্বে লিপ্ত, এমন মনে হতে পারে। বরং আপনি সমান্তরালে, বিপরীত স্থানে বসুন। কিন্তু কিছুটা কৌণিক করে বসবেন। দুজনের মাঝে যেন কোনো বস্তু না থাকে, সেটা নিশ্চিত করুন। যেমন, বইয়ের স্তপ, একটা খোলা ল্যাপটপ ইত্যাদি। নরম সোফায় বসলে লেখার কাজটা কঠিন হয় এবং আরামে গাঁ এলিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

উপযুক্ত চোখাচোখি বজায় রাখুন

সামনে থাকা মানুষটার মুখের অভিব্যক্তি দেখতে পেলে সবসময় আলাপচারিতা ভালো হয়। আপনি যদি নোট নিতে থাকেন, তাহলে কিছুটা সমস্যা হতে পারে, কিন্তু, মাঝেমধ্যেই তাঁর দিকে তাকানোর চেষ্টা করুন। আর যখন প্রশ্ন করবেন তখন অবশ্যই তাকাবেন। আপনি কখনোই প্রশ্নমালা টানা দেখে পড়বেন না। সেটা হলে আপনার সূত্র সন্দেহ করবেন, আপনি সাক্ষাৎকার গ্রহণে অত্যন্ত কাঁচা, আপনি আত্মবিশ্বাসী নন অথবা আপনার সূত্র যা বলছেন তাতে আপনি প্রকৃতপক্ষে মনোযোগ দিচ্ছেন না। এটাকে আপনার রূঢ় আচরণের আলামত হিসেবেও নেওয়া হতে পারে এবং সূত্র কথা বলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

শারিরীক অভিব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক থাকুন

রক্ষণাত্মক অঙ্গভঙ্গি ও চালচলন সংকেত দিতে পারে কৌশলে এড়ানোর চেষ্টাকে। এর মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন কোথায় আপনার প্রশ্নটা আরও কঠিনভাবে করা দরকার। আপনার সূত্র কখন আঘাত পাচ্ছেন, কখন স্বস্তিবোধ করছেন, কখন রসিকতায় মজছেন, কখন রাগান্বিত হচ্ছেন বা বিরক্তিতে পড়ছেন এসব বিষয়েও খেয়াল রাখুন।

অন বা অফ দ্য রেকর্ড

‘অন দ্য রেকর্ড’ মানে আপনার সূত্র আপনাকে যা যা বলেছেন, তার সবই আপনি ব্যবহার করতে পারেন। ‘অফ দ্য রেকর্ড’ মানে আপনি এই তথ্য কেবল ব্যবহার করতে পারবেন, সেসব উপায়ে যেখানে সূত্রের পরিচয় অপ্রকাশিত থাকবে। আর ‘ব্যাকগ্রাউন্ড ওনলি’ মানে আদৌ এই তথ্য ব্যবহার করবেন না। এটা কেবলই আপনি যাতে প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারেন, সেই জন্য বলা। এই ‘অন দ্য রেকর্ড’ বা ‘অফ দ্য রেকর্ড’ মানার ক্ষেত্রে কোনো আইগত বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এটা সাংবাদিক ও সূত্রের মধ্যে একটা সাধারণ সৌজন্যতা।

এই সাক্ষাৎকার ‘অন দ্য রেকর্ড’ বা ‘অফ দ্য রেকর্ড’ তা সূত্রের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিন। সংবেদনশীল বিষয়ের ওপরে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সজ্ঞান সম্মতি নিশ্চিত করুন। সাক্ষাৎকারটা যদি অনানুষ্ঠানিক হয়, তাহলে আপনার নোটবুক ও রেকর্ডার বের করে, ‘বলুন আমি যদি এই কথোপকথন রেকর্ড করি বা নোট গ্রহণ করি, তাতে তাঁর কোনো আপত্তি আছে কিনা?’ সাক্ষাৎকারটা যদি আনুষ্ঠানিক হয়, দ্রুত কাজটা সেরে নিন এবং আপনার সময়টার উপযুক্ত ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, নোট নেওয়া বা রেকর্ড করার কথা শুনলে কোনো কোনো সূত্র ভয় পেতে পারেন। রেকর্ডিংয়ের ডিভাইস লুকিয়ে রাখবেন না। জ্ঞাতসারে লিখুন বা রেকর্ড করুন। সূত্র যদি স্নায়ুবিক চাপ অনুভব করেন, অথবা আপনাকে এটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে ব্যাখ্যা করে বলুন যে এটা কিভাবে আপনার উত্তরগুলো সঠিকভাবে লিখতে সাহায্য করবে।

সব সময়ই নোট নিন

নোট নিলে মূল বিষয়ের ওপরে মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে। এর ফলে অঙ্গভঙ্গি, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও অভিব্যক্তি নথিভূক্ত রাখতে আপনাকে সাহায্য করবে, যা হয়তো আপনার রেকর্ডারে ধারণ করা সম্ভব না। রেকর্ডিংয়ে কোনো সমস্যা হলে এটা একটা ব্যাক আপ হিসেবে থাকবে। সঠিকভাবে নোট নিন, যাতে উদ্ধৃতি, আপনার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মধ্যে যেন স্পষ্ট পার্থক্য টানা যায়।

নিরপেক্ষ, উন্মুক্ত প্রশ্ন করুন

মনোবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে একটা পরামর্শ নিন। এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলুন, যার উত্তরে আপনার অনুভূতি কী হবে, আগেই তার ধারণা পাওয়া যাবে। এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলুন: ‘এটা কী নিতান্তই ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা নয়? ’। এর পরিবর্তে প্রশ্ন করুন: ‘ক্ষমতার এমন ব্যবহারের বিষয়ে আপনার মতামত কী?’ আপনি হয়তো আপনার সূত্রের উদ্দেশ্য বুঝতে চাইছেন। কিন্তু সরাসরি ‘কেন’ এমন শব্দ ব্যবহার করবেন না। কারণ, এটা হয়তো অভিযোগ তোলা বা অবিশ্বাস বলে মনে হতে পারে। সুতরাং ‘কেন’ প্রশ্নটা পরোক্ষভাবে করুন। ‘গণমাধ্যমের এই খবর আপনাকে কেন ক্ষুব্ধ করল’ না বলে বলুন, ‘আপনি বললেন যে গণমাধ্যমের এই খবর আপনাকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ বিষয়ে আমাকে আরও কিছু বলুন’।

নীরবতা খারাপ কিছু নয়

আপনার সূত্রকে প্রশ্নের উত্তর বলতে দিন। পরবর্তী প্রশ্নে যাওয়ার আগে কিছুটা বিরতি দিন। আলাপচারিতায় আপনি শূন্যস্থান পূরণ করতে যাবেন না। যদি সাক্ষাৎকারদাতা একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে চিন্তার জন্য সময় নিতে চান, নিতে দিন; আবেগপূর্ণ অবস্থা থেকে বের হতে সময় নিতে চাইলে আপনি অপেক্ষা করুন। পরে শুরু করুন এই প্রশ্ন দিয়ে: “আমরা কী এখন সামনে এগোতে পারি?”

চেহারায় আগ্রহ ফুটিয়ে তুলন, আগ্রহী হোন

সাক্ষাৎকারের সময় আপনি যা শুনছেন, তার সাথে অব্যাহত মিথস্ক্রিয়ায় থাকতে হবে। উত্তর যা পাচ্ছেন লিখে ফেলুন এবং সেখান থেকে বাড়তি প্রশ্ন বের করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন: আমি যে উত্তর চাই, এটা কি সেটা? আমি কী এটা বুঝেছি? অমি এটাকে কীভাবে ব্যবহার করব? একবার সাক্ষাৎকার নেওয়া শেষ হয়ে গেলে দ্বিতীয়বারের জন্য সেখানে ফিরে যাওয়া খুবই কঠিন। আপনি যথেষ্ট গবেষণা করে প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়ার পর দেখলেন নানাভাবে চেষ্টা করেও আপনি যা প্রত্যাশা করে আছেন আপনার সূত্র তা বলছেন না। উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। বিষয়টি ছেড়ে দিন। অথবা বিষয়বস্তু বদলে নিন। নতুন বিষয়ের দিকে এগিয়ে যান। নতুন প্রেক্ষাপটের ওপরে সাড়া দিন এবং ফলো-আপ জেনে নিন। আগে থেকে তৈরি হওয়া ধারণানির্ভর বিবরণ বা স্টোরির মধ্যে সূত্রকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বরং, আপনি অপ্রত্যাশিতভাবে যা পেলেন তা অধিকতর ভালো স্টোরির দিকে নিয়ে যেতে পারে। যদি সেটা না হয়, তাহলে আপনি পরবর্তীতে আপনার আসল বিষয়বস্তুর দিকে ফিরে যেতে পারবেন। আপনার সূত্রের সঙ্গে আগ্রাসী মনোভাব দেখাবেন না। সাক্ষাৎকারটা যদি আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী সঠিক পথে না এগোয়, তবুও না। এমনকি সাক্ষাৎকারদাতা রূঢ় আচরণ করলেও নয়।

সময়কে শ্রদ্ধা দেখান

ঘড়ির কাটার দিকে চোখ রাখুন। প্রশ্নের গতি ঠিক রাখুন। প্রতিশ্রুত সময়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলে বলুন, “আরও কয়েকটি প্রশ্নের জন্য আমাদের কী সময় হবে?”
সাক্ষাৎকারের ইতি টানার সময় এরপরে কী ঘটবে সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারদাতাকে নিশ্চিত করুন। বলতে পারেন, “এই খবরটা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হবে।” তবে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেবেন না যা আপনি রাখতে পারবেন না। যেমন, খবরটা প্রকাশের আগেই তাঁকে দেখার সুযোগ করে দেবেন, এমন প্রতিশ্রুতি।

খবর যা, তা-ই বলুন

ভালো সাংবাদিকেরা সূত্র থেকে পাওয়া উপাদানগুলোকে সততার সঙ্গে ব্যবহার করবেন। স্পষ্টতই, সাক্ষাৎকারের সময় যা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে আপনার মিথ্যাচার করা উচিত হবে না। সাক্ষাৎকারের পর কোনো প্রশ্নের বা তার জবাবের অর্থ আপনি উল্টে দিতে পারেন না। কোনো উদ্ধৃতিকে প্রেক্ষাপটের বাইরে নিতে পারবেন না। আসল সাক্ষাৎকারে যে ধারাক্রমে উত্তরগুলো এসেছিল, সেখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন। আনাড়িভাবে দুটো বিষয় পাশাপাশি স্থাপনের সময় সত্যটাকে দূর্ঘটনাবশত বিকৃত করে ফেলা খুবই সহজ। আপনার স্টোরিটা বলুন। এরপর স্টোরিটা যাদের বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরুন। পাঠক-শ্রোতা-দর্শকেরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান; সত্যটা কোথায় আছে, তা ঠিকই তাঁরা ধরে ফেলবেন।

অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকার কীভাবে ভিন্ন?


সব ধরনের সাক্ষাৎকারের জন্যই প্রস্তুতি ও নমনীয়তা দরকার। কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ভিন্ন ধরনের কিছু জিনিস প্রয়োজন হয়, যেটি হয়তো আপনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার ধরনের ওপরও প্রভাব ফেলবে। কাজের নিজস্ব চরিত্রের কারণে আপনি হয়তো আপনার সূত্রের কাছ থেকে শত্রুভাবাপন্ন আচরণ পেতে পারেন। বা হয়তো তিনি রক্ষণাত্মক হয়ে যাবেন বা আপনাকে এড়িয়ে চলবেন। এখানে থাকছে অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারের জন্য এমন কিছু বিবেচ্য বিষয়।

উপযুক্ত সময়জ্ঞান

আপনি অনুসন্ধানের কোন পর্যায়ে গিয়ে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মূল ব্যক্তিদের মুখোমুখি হবেন? খুব তাড়াতাড়ি হলে তারা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যাবেন, অথবা প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকাতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আরোপের উপায় খুঁজবেন বা তথ্যপ্রমাণ লুকিয়ে ফেলবেন। আবার, খুব দেরিতে হলে তাঁরা হয়তো তার আগেই পালিয়ে যাবেন, আপনার প্রশ্নের একটা সাদামাটা বা চতুর উত্তর তৈরি করে নেবেন, অথবা আপনার প্রশ্নের উত্তর এড়াতে আইনি ফাঁকফোঁকর বের করে ফেলবেন। তাই আপনার উচিত হবে, কেন্দ্রীয় চরিত্রদের কাছে যাওয়ার আগে যত বেশি পরিমাণে সম্ভব তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা। সেটি বিভিন্ন নথিপত্রও হতে পারে, বা কয়েক জায়গা থেকে নিশ্চিত হওয়া কোনো তথ্যও হতে পারে। এভাবে আপনার হাতে অনেক তথ্যপ্রমাণ আসবে, যার ওপর নির্ভর করে আপনি প্রতিবেদনটি তৈরি করবেন।

সুরক্ষাহীনতা

যদি আপনার স্টোরি পুরোপুরি তৈরি বা সঠিক নাও হয়, তারপরও আপনি হয়তো ‘কিছু একটার ওপরে’ কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে, আপনি মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করলে আপনি যে ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করছেন, তাঁরা বা ক্ষমতাবান লোকজন সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে দেবে। তাঁরা বুঝতে পারবেন যে আপনি তাঁদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারেন। তাঁরা তখন যেকোনো ধরনের পথ অনুসরণ করতে পারেন। সাধারণভাবে অস্বীকার করলে তা মোকাবেলা করা সহজ এবং আপনি আপনার অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু, নানা ধরনের হুমকিও আসতে পারে। যেমন, সরাসরি শারীরিক হামলা, মামলার হুমকি, অথবা তৃতীয় কোনো পক্ষের (প্রায়ই আপনার সম্পাদক বা প্রকাশক) মাধ্যমে ভয় দেখানোর মত সুক্ষ্মতর কিছু। সংবাদটি প্রকাশের ওপর আইনী ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। আর এসব কিছুর কেন্দ্রে থাকবে ‘মানহানি’ শব্দটি, যদিও প্রায়শই মানহানির মামলা হয় না।

বিচক্ষণতা

যেসব বিষয় অজানা সেগুলোকে আলোর মুখ দেখানোই অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের লক্ষ্য। হতে পারে অজানা বিষয়টি নিয়ে সবাই ইচ্ছে করে মিথ্যা বলছেন, অথবা জেনেশুনে নীরব থাকছেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন মন্ত্রী সংসদে দরিদ্র তরুণীদের পাচার নিয়ে মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু এই বিষয় নিতে তিনি আপনার সাথে আলোচনা করতে রাজি নন। আপনার অনুসন্ধানের ফলাফলটা সাড়া জাগানো না হলেও, চমকপ্রদ হবে। এমন অবস্থায়, তার সাক্ষাৎকার নিতে হবে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে। শুরুতেই যদি আপনি সাক্ষাৎকারে যা চাইছেন তা প্রকাশ করে দেন, তাহলে সূত্র হয়তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানাবেন। আপনি যদি সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থানটার কথা প্রচার করেন,তাহলে আপনি হয়তো সাক্ষাৎকারদাতাকে বিপদের মুখে ফেলবেন।

সাক্ষাৎকারের কৌশল ঠিক করা

একটা সাধারণ সাক্ষাৎকারের তিনটা সম্ভাব্য কৌশল রয়েছে। যখন আপনি পটভূমি বা তথ্য নিশ্চিত করার জন্য সাক্ষাৎকার নেবেন, তখন প্রশ্নগুলো খুব একটা কঠিন হবে না। আলাপ এগুতে থাকবে, কিন্তু প্রশ্নগুলো খুব বেশি ধীরে ধীওে আরো সংবেদনশীল বা কঠিন হয়ে উঠবে না। আর কোনো ব্যক্তির জীবন-কর্ম নিয়ে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে প্রশ্নমালার শুরুটা হবে সেই ব্যক্তির ওপরে সংকীর্ণ পরিসরে মনোযোগ স্থাপনের মাধ্যমে, যেমন, তিনি কোন স্কুলে পড়েছেন? কাকে বিয়ে করেছেন এবং কেন? কীভাবে তাঁরা কবিতা লিখতে শুরু করেন? এখানে কিছু কিছু বদ্ধ প্রশ্নও করা হয়, যেখানে সেই ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বর্পূণ তথ্য উঠে আসে। কিন্তু আপনার পাঠকেরা সেই ব্যক্তির মতাদর্শের বিষয়েও জানতে আগ্রহী। সুতরাং সাক্ষাৎকারটি যতটা এগোতে থাকবে, এটা কে ততই তার পরিসর বিস্তৃত হতে থাকবে। আধুনিক উপন্যাসের অবস্থা সম্পর্কে তিনি কী মনে করেন? তিনি কী সাহিত্য পুরস্কারগুলোতে বিশ্বাস করেন এবং তিনি চলতি বছরের মনোনীত ব্যক্তিদের বিষয়ে কী মনে করেন? এই ধরনের সাক্ষাৎকার অনেকটা ট্রাম্পেট (একধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজানোর মতো। এটা সংকীর্ণ একটা পথ দিয়ে শুরু হবে। এরপর ধীরে ধীরে বৃহৎ পরিসরের দিকে যাবে। সাক্ষাৎকার যত এগোবে, ততই বেশি খোলামেলা প্রশ্ন শুরু হবে।

অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো কৌশল নিতে হয়। এটার শুরু হয় বড় ও সাধারণ ইস্যুগুলো দিয়ে (যেমন, সরকারি টেন্ডার প্রদানের জন্য প্রক্রিয়াটা কী? এই প্রক্রিয়াটা কী সন্তোষজনক? সরকার কীভাবে এটার ওপর নজরদারি করে?) আর সাক্ষাৎকার যতই এগুতে থাকে ততই তা খুঁটিনাটির দিকে মনোযোগী হয়। অনুসন্ধানমূলক সাক্ষাৎকারের চূড়ান্ত ও কঠিন প্রশ্নগুলো প্রায়ই হয় সুনির্দিষ্ট, অনেকটা হাঁ বা না জবাবের মত ( ক্লোজড কোশ্চেন)। যেমন, “বিশেষ এই চুক্তির ক্ষেত্রে কী আপনি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করেছেন? কেন?” আপনি এই প্রশ্নগুলো শেষে করবেন। কারণ, এটা সেই জায়গা, যেখানে আপনার সূত্র হয়তো থেমে যাবে। এরপর তিনি হয়তো আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইবেন না। এই সাক্ষাৎকারের কাঠামোটা হয় একটা চিমনির মতো। এটা শুরু হয় বড় পরিসরে, কিন্তু, শেষ হয় সংকীর্ণ জায়গায়।

অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারে আপনার করণীয়


উত্তর পাওয়াই জরুরী

আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে সব সময়ই তথ্য পাওয়া; ‘বিজয়ী’ হওয়া নয়। একটা ঠান্ডা ও শান্তশিষ্ট অবস্থান নিন। আপনার যতটা প্রয়োজন ততটা সময় নিন। সাক্ষাৎকারের কৌশল সব সময়ই হওয়া উচিৎ তথ্য ও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া। আপনার প্রশ্নমালা হচ্ছে একটা লক্ষ্য অর্জনের একটা উপায়। যেকোনো ধরণের আবেগের বহিপ্রকাশ (ভ্রু কোঁচকানো, কাঁধ ঝাঁকানো, মৃদু হাসি) দিলেই তা আপনার সূত্র বুঝতে পারবেন। আপনি একজন মানুষ। আপনার সাড়াতে তার প্রতিফলন থাকতে পারে। আর টিভিতে প্রতিক্রিয়াহীন মুখায়বয়ব বিরক্তিকর দৃশ্য তৈরি করে। কিন্তু সতর্ক থাকুন এবং সীমাটা জেনে নিন। হঠাৎ প্রকাশিত কোনো উচ্ছ্বাস সূত্রকে মনে করিয়ে দিতে পারে যে তাঁর বলা শব্দগুলো ‘অন ট্রায়াল’ রয়েছে। তিনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর সজাগ হয়ে উঠতে পারেন। কোনো বিষয়ে উষ্কানি মোড় নিতে পারে নাটকীয় দ্বন্দ্ব-বিরোধ বা নিস্ফল বর্জনে। আপনার আগ্রাসী আচরণ এতটাই অনুপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে যে, এর কারণে আপনাকে দেখতে খুবই খারাপ লাগতে পারে। আপনার সাড়াটা যে ইচ্ছাকৃত সেটা বুঝতে দিন; স্বতস্ফূর্ত নয়। মনে রাখুন, কেউ যদি কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়, তাহলে তার সুযোগ নিয়ে সে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে বেঁচে যেতে পেতে পারে।

আসল বিষয়ে যান

আপনার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের চেয়ে সূত্রের উত্তরগুলোর গুরুত্ব বেশি। সুতরাং প্যাঁচাবেন না এবং হঠাৎ হঠাৎ বাধা দেবেন না। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক বা ব্যবসায়ী হয়তো শত শত বা হাজারো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাঁদের সময়টা অত্যন্ত মূল্যবান। তাঁরা যদি একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান, সেটা তাঁরা করবেনই। তাঁরা এটা বোঝেন যে, তাঁরা যেসব সমস্যা সৃৃষ্টি করেছেন সেটা যদি আপনি প্রকাশ করে দেন তাহলে তাঁদের মুখ থাকবে না; অবস্থান ও অর্থ দুটোই হারাবেন। এমনকি মাঝেমধ্যে পুরো ক্যারিয়ারই নষ্ট হতে পারে। পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা ভালোভাবে বুঝে নিন। যদি দেখা যায় নরম বা নমনীয় প্রশ্ন কাজে আসছে না, তাহলে সোজাসুজি বলে ফেলুন। যদি তাঁদের জবাবটা সহজে বোধগম্য না হয়, তাহলে ঢেলে সাজিয়ে ভিন্নভাবে প্রশ্নটি করুন এবং আবার চেষ্টা করুন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সূত্রের চিন্তার জন্য সময় প্রয়োজন হয় এবং আরেকবার উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলে তাঁরা খুশি হন। সব জবাব সতর্কতার সঙ্গে শুনুন – আপনার জবাব সত্যিই কি পেয়েছেন?। আপনার সূত্র যা বলছে, আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা পেয়েছেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে আপনি সেই উত্তরটা তাঁদেরই আবার শুনিয়ে দিতে পারেন (যেমন, আপনি যেটা বলতে চাইছেন, তা হচ্ছে…)।

পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে যা করতে হবে

আপনার সূত্র যখন যথোপযুক্ত উত্তর দিতে চান না, তখন তিনি ‘সম্প্রতি’, ‘কয়েকটি’, ‘অনেক’, ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। এমন ক্ষেত্রে আপনাকে ফলো-আপ প্রশ্ন করতে হবে, যা অধিকতর সুনির্দিষ্ট উত্তর বের করে আনবে। যেমন, ‘কখন?’, ‘কতগুলো?’, ‘আপনি কী সংখ্যাটা আন্দাজ করতে পারেন?’ অথবা ‘ঠিক কী করবেন?’।
বদ্ধ প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা। সাক্ষাৎকারদাতা হয়তো একটা প্রশ্নে লাইন টেনে দিতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেবেন। কখনো কখনো আপনার তার চেয়ে বেশি তথ্য লাগবে। তখন সেই প্রশ্নে আবার ফিরতে হবে; যেমন,

‘আপনি কি চুক্তিটা সই করেছেন?’
‘হ্যাঁ’।
‘এটা করার ক্ষেত্রে আপনার উদ্দেশ্যটা কী একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন?’

প্রতিটি প্রশ্নের জবাব সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করার পরই পরবর্তী প্রশ্নে যান। দক্ষ সাক্ষাৎকারদাতারা হয়তো এমনভাবে সব উত্তর দেবেন, যাতে মনে হতে পারে আপনি এটাই শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, যখন আপনি পুনরায় আপনার নোটগুলো পড়বেন, তখন হয়তো আপনি দেখতে পাবেন যে তাঁরা ধোকা দিয়ে আপনার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন।

আপনি প্রশ্ন করলেন: ‘আপনি কী …জেলার ক্লিনিকে ওষুধগুলো পাঠিয়েছিলেন?’
তাঁরা উত্তর দেবেন, ‘অবশ্যই, ওই ক্লিনিকের জন্য সব ধরনের উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।’

এখানে ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর রয়েছে। কিন্তু আপনি সরাসরি যে প্রশ্নটা করলেন, তার সঠিক জবাব এখানে নেই। আপনাকে তখন ফলোআপ প্রশ্ন করতে হবে: ‘কী কী ওষুধ পাঠিয়েছেন?’ কোন তারিখে সেগুলো পাঠানো হয়েছে?’ সেগুলো যে পাঠানো হয়েছে, এ বিষয়ে আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে?’ ‘সেগুলো যে পৌঁছেছে, এ বিষয়েই বা আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?’ আপনি যদি সূত্রের কোনো উত্তর বুঝতে না পারেন, সেটি তাঁকে বলুন। বোঝার ভান করার চেয়ে আপনি যে পরিস্কার বুঝতে পারেননি সেটা স্বীকার করা ভালো। আপনি বলতে পারেন, ‘আমাদের পাঠকেরা/দর্শকেরা এটা হয়তো বুঝতে পারবেন না। এটা কী আরও সহজভাবে আপনি আবার ব্যাখ্যা করবেন?’ তা না হলে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করার কৌশল প্রয়োগ করুন: ‘মন্ত্রী মহোদয়, আমি যদি আপনার কথা সঠিকভাবে বুঝে থাকি, তাহলে আপনি বলতে চাইছেন …। আসলেই কী তাই?’

কাগজ ঘাটাঘাটি ও রেফারেন্স দেওয়া

সাক্ষাৎকারের সময় আপনার কাছে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রেসবিজ্ঞপ্তি, নথিপত্র গবেষণা-সমীক্ষা বা ছবির কপি আছে কি না নিশ্চিত হয়ে নিন। সাক্ষাৎকারদাতা অপ্রত্যাশিত কিছু বলতে পারেন। এমন ক্ষেত্রে আপনি ওই সব নথিপত্র থেকে রেফারেন্স দিতে পারেন। আপনারা টেপ রেকর্ডার ও মাথা দুটোই সচল রাখুন। আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এগুলোর রেকর্ড ধারণ করা থাকবে। উপযুক্ত মনে হলে, ফলোআপ প্রশ্ন করার জন্য অনুমতি চাইতে হবে।

তোষামোদে ভুলবেন না

এটা একটা সাক্ষাৎকার, বন্ধুত্ব নয়। তথ্য আবিষ্কার করতেই আপনি এখানে এসেছেন; কারো পৃষ্ঠপোষকতা পেতে নয়। কেউ হয়তো আপনাকে বলবেন: “এটা দারুণ একটা প্রশ্ন”। এর মাধ্যমে তিনি আপনাকে সম্মান দিচ্ছেন না। বরং, উত্তর খুঁজতে বা ভাবতে কিছুটা সময় বের করে নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকারের পর সূত্রকে অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ করে দিন। আশ্চর্য হবেন, কিন্তু এখান থেকেও নতুন কিছু জানা যায়। এরপর প্রশ্ন করুন, আপনার কাছে তাঁর কিছু জানার আছে কিনা। এটাও এক ধরনের সৌজন্যতা। আবার, কীভাবে কখন স্টোরিটা প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়টা তাঁর কাছে ব্যাখ্যা করার ও একটা সুযোগ। সবসময়ই এই প্রশ্নটা দিয়ে সাক্ষাৎকার শেষ করুন: “কিছু কি বাদ পড়েছে?” অথবা “এমন কিছু আছে যা আপনি যোগ করতে চান?”

শেষ সময়ের সৌজন্য

সাক্ষাতকারের শেষ বেলায় প্রায়ই দেখা যায়, সূত্র অধিকতর সাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন। তিনি অনেক খোলাসা হয়ে উঠেছেন। এই সময়টার সদ্ব্যবহার করুন। সাক্ষাৎকারের সময় কোনো পরিভাষা, শিরোনাম বা নাম আসলে সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করে নিন। পরবর্তীতে কোনো তথ্যের বিষয়ে পরিস্কার হওয়া লাগতে পারে। এ জন্য ফোন নম্বর, ইমেইল ঠিকানা ইত্যাদি চেয়ে নিন। আপনার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য বা আপনার কার্ড তাঁকে দিন। শেষ সময়ের সৌজন্যতাকে কখনোই অবজ্ঞা করবেন না। সময় দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আপনি যদি অপদস্থ/অপমানিত হন, তবুও। এমনভাবে কথা বলুন যেন তিনি বুঝতে পারেন যে আপনার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হওয়ার বিষয়টিকে আপনি সত্যিই প্রশংসা করছেন।

এই সাক্ষাৎকারটি যদি ঘটনার প্রেক্ষাপট তথ্য পাওয়ার জন্য হয়ে থাকে অথবা ভাবটা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে আপনি সূত্রের কাছে জানতে চাইতে পারেন যে তিনি অন্য কোনো সূত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিতে পারেন কি না, যার কাছে ঘটনার বিষয়ে বাড়তি অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যেতে পারে। এই ব্যক্তির নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে হয়তো আপনার সামনে নতুন দরোজা উন্মোচিত হবে।

প্রতিশ্রুতি

সাক্ষাৎকার শেষে সরঞ্জাম গোছানোর সময় বা বিদায় নেওয়ার সময়ে বেখেয়াল হয়ে এমন কোনো সুযোগ তৈরি করবেন না যাতে সাক্ষাৎকারদাতা পরে দাবি করতে পারেন যে স্টোরি প্রকাশ প্ওায়ার আগে তাঁকে সেটা দেখতে দিতে আপনি রাজি হচ্ছেন। এ ধরনের আলাপ উঠলে বিষয়টি পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন: “না, আসলে তা নয়। প্রকৃতপক্ষে আমি বলবো, আপনি যদি আলোচনা করতে চান, তাহলে আমার সম্পাদকের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ করা উচিত।” তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য আপনাকে দিচ্ছি।” গণমাধ্যম বোঝেন এমন ব্যক্তিরা শেষ মুহূর্তে এধরণের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। সুতরাং, আপনি আচমকা ফাঁদে পা দেওয়ার বিষয়ে সজাগ থাকুন!

সাক্ষাৎকারের পরপরই নোটগুলো যাচাই করুন

সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পরপরই আপনার নেওয়া নোটগুলো পুনরায় পড়ে নিন। আপনার স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর এটাই উপযুক্ত সময়। আপনি যদি পরবর্তী দিনের জন্য নোটগুলো ফেলে রাখেন, তাহলে হয়তো অনেক কিছুই ভুলে যাবেন, বিশেষ করে সংক্ষেপে বা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের মাধ্যমে যেসব তথ্য লিখে রেখেছেন সেগুলো। দ্বিতীয়বারের মত যাচাই করা তখনই জরুরি। আপনার নোটের শূন্যস্থাণগুলো পূরণ করে নিন এবং কোন জায়গায় ফলোআপ সাক্ষাৎকার দরকার হতে পারে, তা ঠিক করে নিন।

‘স্পিন ডক্টর’-দের কিভাবে সামলাবেন?


জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এখন ক্রমবর্ধমানভাবে ‘স্পিন ডক্টর’রা (দাপ্তরিক মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তারা) ভূমিকা রাখছেন। মাঝেমধ্যে, তাঁরা এমনকি সাক্ষাৎকারেও বসে যান কিম্বা কোনবিষয়গুলো আলোচনায় তোলা যাবে না তার একটা আগাম তালিকা দিয়ে দেন ।

যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকার সাবেক রিপোর্টার ডেনিস বারকার একজন ব্রিটিশ সরকারি মুখপাত্রের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) কাছ থেকে ‘স্পিন ডক্টর’দের ভূমিকা সম্পর্কে নি¤œলিখিত ধারণা পেয়েছিলেন।

তাঁরা এমন কিছু অজুহাত দেবেন, যা হয়তো সত্য। কিন্তু সত্য হলেও সেগুলো নিতান্তই অজুহাত, এবং আপনি সেগুলো চ্যালেঞ্জ করার অধিকার রাখেন। ‘আপনি যদি এটা না বলতে পারেন, তাহলে কে বলতে পারবেন’ – এটা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রায়ই, আপনি যে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করছেন, তারা হয়তো আরেক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশের অধীনে কাজ করে। তাই তারা হয়তো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেবে না। অন্যভাবে বললে, তারা যখন মুখে কুলুপ আঁটবে, বা তথ্য না দেওয়ার চেষ্টা করবে, সেটা নেহায়েৎ তাদের চাকরির অংশ হিসেবেই করবে। এটা সেই মুখপাত্রের সমস্যা, আপনার নয়। বিশেষ কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া সরকার নিজেদের সমালোচনা হতে দেবে না। মুখপাত্রকে যদি নেতিবাচক বার্তাগুলোর পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক বার্তাও তুলে ধরারও সুযোগ দেন, তাহলে হয়তো তিনি কিছুটা মুখ খুলতে পারেন।

নাগরিক সমাজের সদস্যরা সেসব ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন, রিপোর্টাররা সেগুলো নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকেন। এগুলো যদি সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না হয়, তাহলে তা অবশ্যই ন্যয়সঙ্গত একটা উদ্বেগ। প্রশ্ন করুন: “আপনি কেন এগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন না?”, “সরকার কেন এগুলো নিয়ে আরও বেশি চিন্তিত নয়?” সরকার যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবে, রিপোর্টারের সেগুলো অগ্রাধিকার নাও হতে পারে। সরকারের হয়তো “বৃহত্তর উদ্বেগ” থাকতে পারে। সরকারের মুখপাত্ররা সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়েন তখনই যখন সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রশ্ন করা হয় যেগুলো এড়ানোকেই তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব মনে করেন।

ঠিকাঠাক জানাশোনা, অভিজ্ঞ ও ঠান্ডা মাথার সাংবাদিকের বদলে আগ্রাসী মনোভাবের নবীন সাংবাদিকদের কথা দিয়ে সন্তুষ্ট করা সহজ। মুখপাত্ররা সব সময়ই আশা করেন, সাধারণ কিছু তথ্যেই রিপোর্টাররা সন্তুষ্ট হবেন; বাড়তি আর কিছু চাইবেন না। যখন তাঁরা চিন্তা করবেন, ‘এর ভেতরে কোনো শিরোনাম নেই’, তখন আপনি দেখতে পাবেন, অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গেই তাঁরা তাঁদের আগ্রহের পারদটা নামিয়ে নিচ্ছেন। অন্যভাবে বললে, ‘স্পিন’ কৌশল হচ্ছে এমন: রিপোর্টাররা সংবেদনশীল কিছু হন্যে হয়ে খুঁজলে মুখপাত্ররা খবরটার গুরুত্ব কমিয়ে রিপোর্টারদের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। রিপোর্টাররা এর ভেতরে কোনটা নতুন তথ্য তা বের করে সংরক্ষণ করলে ভালো একটা স্টোরি হলেও হতে পারে। এমনকি, সে সময়ে তা বিরক্তিকর মনে হলেও পরে কাজে আসতে পারে।

আপনার তথ্য সঠিক নয় বলা হলেই সেটাকেই সত্য বলে ধারণা করা উচিত হবে না। বরং, ‘আমি ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু…’ বলে আপনি আপনার গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ফলো-আপ প্রশ্ন করুন। আপনার প্রশ্ন ফিরিয়ে দিলে ঘুরিয়ে আবার করুন। কিছু ‘স্পিন ডক্টর’ পাল্টা প্রশ্ন করে আপনার প্রশ্নের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন: ‘মন্ত্রী বিবাহিত। এরপরও কীভাবে তিনি এমন একটা প্রণয়ে জড়িয়ে পড়বেন? আপনারা সাংবাদিকেরা কেন এই ইস্যুতে আটকে থাকছেন?’ তখন আপনার উচিত হবে বলা, ‘জনাব মুখপাত্র, আপনি অবশ্যই জানেন যে, একজন সাংবাদিকের ভাবনার বিষয়ে কেউ আগ্রহী নয়। পাঠকদের আগ্রহের কারণেই আমি এখানে এসেছি। মন্ত্রীর বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাদের কাছে প্রচুর চিঠি এসেছে। সুতরাং…?’

আপনি যদি মনে করেন, উত্তরটা আসেনি। আবার প্রশ্ন করুন: “আমি এই উত্তর পুরোপুরি বুঝতে পারি নি। আপনি কি আবার বিষয়টি একটু বলবেন?” অথবা “আমি নিশ্চত নই যে আপনি আমার প্রশ্নটার উত্তর পুরোপুরি দিয়েছেন।” উত্তরটা যে সঠিকভাবে আসেনি, তা বোঝানোর ভদ্রোচিত উপায় এটা। “আপনি কী এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না?”, “উত্তর দিতে আপনার বাঁধা কোথায়?”, “আপনি যদি আমাকে বলেন, তাহলে কী ঘটতে পারে?”, “কে আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন?”

কঠিনতম প্রশ্নগুলোর দিকে যাওয়ার জন্য নানামুখী উপায় ভাবুন: মাঝেমধ্যে জটিল তথ্য জানতে চাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, সোজাসুজি প্রশ্ন করে ফেলা। কিন্তু যদি আপনি দক্ষ একজন মুখপাত্রের সামনাসামনি হন, তাহলে দেখতে পাবেন, অধিকতর সুক্ষ্ম পন্থাগুলো কখনো কখনো কাজে দেবে। যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি প্রশ্ন করলে প্রত্যাখাত হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেসব ক্ষেত্রে এটা ভালো কাজে দেয়। এখানে কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো। তাঁদের কিছুটা সাবধান করে দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার একটা সুযোগ করে দিন: “সম্ভবত এই প্রতিবেদনগুলো আপনি পড়েছেন, যেখানে এই ইঙ্গিত আছে… তাই নয় কী?”, “আমি জানি যে, এটা একটা অস্বস্তিকর ইস্যু, কিন্তু আমাদের পাঠকেরা চান, আমি বিষয়টি তুলি…”, “সঠিক তথ্য রেকর্ড করতে আমাকে সাহায্য করুন…”, “পার্লামেন্টে বিরোধী দল বলেছে, আপনি… ”, “আপনি কী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান?”

স্টোরিতে সূত্রের অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি লিখুন


কোনো সূত্র আদৌ কথা বলতে নাও চাইতে পারেন, তাই, সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিন। টেলিভিশন বা রেডিওর জন্য রেকর্ডিংয়ে সাক্ষাৎকারদাতার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উত্তর দিতে অস্বীকৃতি শোনা যেতে পারে, যা সম্পাদনার সময়ে আপনি দক্ষভাবে উপস্থাপন করে শুনিয়ে দিতে পারেন। ছাপা কাগজে আপনি লিখতে পারেন, ‘অমুক এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন’। আপনি যা লিখবেন, তাতে জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলার দরকার নেই, শুধু জবাব দেননি সেটাই জানিয়ে দিন। কেউ কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানালে পাঠকই তার বিচার-বিশ্লেষণ করে নেবেন।

আপনার যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে আপনার সূত্র সরাসরি অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে হয়তো সাক্ষাৎকারটাই বাদ দিতে হতে পারে। মাঝেমধ্যে এটা কাজে দিতে পারে: “আমি সত্যিই দুঃখিত, মাননীয় মন্ত্রী। আমি আগে থেকে ধারণা করতে পারিনি যে, এই ইস্যুগুলোতে আপনার কাছ থেকে কিছুই জানতে পারব না। অথচ, এগুলোই আমার স্টোরির মূল বিষয়। এখন এ বিষয়ে কেবল আমার পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। আমি কি এটা বলে দেব যে আপনার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য নেই।” এরকম অবস্থায়, সাক্ষাৎকারদাতা বুদ্ধিমান হলে হয়তো সিদ্ধান্ত নেবেন কিছু বলার। তখন তাঁর মনে হতে পারে, এই প্রতিবেদনে তাঁর কোনো বক্তব্য না যাওয়ার চেয়ে কিছু বলাই ভালো। কিন্তু তাঁরা যদি সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে ভদ্রতার সঙ্গে বিষয়টি ছেড়ে দিন।

আপনাকে আগেভাগেই বলা হতে পারে, নির্দিষ্টভাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। এরপরও আপনার উচিত হবে সব প্রশ্ন উত্থাপন করা এবং বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা। বিশেষ করে সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য এটা সত্য। আপনার সাক্ষাৎকারদাতা এবং পাঠক-দর্শক জানতে পারলেন, অন্তত আপনি প্রশ্নগুলো করেছেন। আপনি যদি সেটা না করেন, তাহলে নিজে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। সবাই বলবে, আপনি প্রশ্নটা করেনইনি। আপনার সূত্রই হয়তো পরে দাবি করে বসবেন, আপনি প্রশ্নটা করলে তিনি অবশ্যই উত্তর দিতেন। তখন আপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হতে পারে।

 বিতর্ককে দূরে রাখুন


সাক্ষাৎকারের কোনো পর্যায়ে আপনাকে হয়তো খুবই নাড়া দেওয়া কোনো প্রশ্ন করতে হতে পারে। যেমন আপনার সাক্ষাৎকারদাতার সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্পর্ক আছে- এমন অভিযোগ। সেক্ষেত্রে আপনি এই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন: “আমার এই সাক্ষাৎকারে এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি তাতে পরস্পরবিরোধী ধারণা তৈরি হয়। যেমন…”, “আমার সম্পাদক বলে দিয়েছেন, আমি যেন এই এই প্রশ্নটা অবশ্যই আপনাকে করি…।” গাছে ঝাঁকি মারুন, কিন্তু কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। অথবা, অন্য কোনো সূত্রের পরিচয় বলে দেবেন না। উদাহরণস্বরূপ, আপনি বলতে পারেন: “এটা হয়তো আপনি জানতে আগ্রহী হবেন যে অন্য একটি সূত্র আমাকে জানিয়েছেন, তিনি আপনাকে দেখেছেন…”, অথবা “আপনার বিষয়ে একটা গুজব আছে। কিন্তু, আমরা সবাই জানি এই গুজবটা কতটা অনির্ভরযোগ্য”।

গোপন সাক্ষাৎকার


গোপনে রেকর্ড ধারনের বিষয়ে অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানেরই কঠোর নীতিমালা রয়েছে। আর কিছু দেশের আইনি বিধিবিধানেই এটা নিষিদ্ধ। যে যাই হোক, আপনি যেসব তথ্যপ্রমাণ চাইছেন, তা পাওয়ার জন্য মাঝেমধ্যে হয়তো এটাই হবে একমাত্র উপায়। এক্ষেত্রে অনুশীলন অপরিহার্য! আপনি হয়তো আপনার বুকে গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু তাতে যদি শুধু আকাশ বা মেঝের ছবি দেখা যায়, তাহলে সেই ছবি খুব একটা কাজে আসবে না। যদি শব্দগুলো অস্পষ্ট বা শোনা না যায় তাহলে হয়তো আপনার সময় ও শ্রমটাই নষ্ট হবে। টেলিভিশনের নাটকে যতটা সহজ দেখা যায়, গোপন সাক্ষাৎকার আসলে ততটা সহজ নয়। কারিগরি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের পাশাপাশি, আপনার এমন সাক্ষাৎকার কৌশল জানা থাকতে হবে, যার কারণে লোকজন আপনার সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ পাবে এবং এমন তথ্য দেবে যা আপনার দরকার। নাহলে, আলাপচারিতা এতটাই কৃত্রিম শোনাতে পারে যে তাতে আপনার কৌশলটা প্রকাশ হয়ে যাবে।

আপনার সূত্র যদি সন্দেহ করেন, আপনি তাঁর কথা গোপনে ধারণ করছেন, তিনি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে তা জানতে চাইতে পারেন। তখন আপনি নিজেকে রক্ষার জন্য মিথ্যা বলতে বাধ্য। এমন পরিস্থিতিতে আপনি গোপনে রেকর্ডের যন্ত্রে ধারণকৃত বক্তব্য ব্যবহারে সমস্যায় পড়বেন। আপনি এই আলাপচারিতা রেকর্ড করার বিষয়টি অস্বীকার করলে, আপনাকে আইনগতভাবে সমস্যায় পড়তে হবে, কেননা আপনি তাঁকে রেকর্ড করা হচ্ছেনা এমন ধারণা দিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করেছেন। জনস্বার্থের বিষয় না হলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম আইনজীবীরা এ ধরনের সাক্ষাৎকারের উপাদান ব্যবহারের বিরুদ্ধে। অন্যান্য দেশের আইনজীবীরাও এ বিষয়ে একমত।

অনাগ্রহ ও ভয়ভীতিকে কীভাবে সামলাবেন?


অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাওয়ার পেছনে সাক্ষাৎকারদাতার অনেক যৌক্তিক কারণ থাকে। অনেক দেশেই, ‘অবিশ^স্ত’ সংবাদমাধ্যম ও তাদের এমন তথ্যদাতারা হয়রানির বা আরো খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তা ছাড়া, আপনি যাদের সাক্ষাৎকার নিতে চাইছেন, তাঁরা হয়তো একটা মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অনীহা থাকতে পারে। অথবা তাঁরা যেসব একান্ত তথ্য প্রকাশ করলে নিজস্ব জনগোষ্ঠীর ভেতরে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় থাকতে পারে। মৃদু অধ্যাবসায় হয়তো কখনো কখনো কাজে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, আপনি যদি কাউকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন। সেটা করতে পারলে অনাগ্রহী একজন সূত্রও কথা বলতে রাজি হতে পারেন।

সূত্র কিসে ভয় পান, সেটা আগে খুঁজে বের করুন। সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়ে তাঁকে যতটা সম্ভব আপনি আশ্বস্ত করুন। এর অর্থ হতে পারে, তাঁকে কী ধরনের সুরক্ষা দেওয়া যাবে, সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে সে বিষয়ে আপনার সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া। কারণ, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি আপনার দেওয় া উচিত নয়, যা আপনি পরে রাখতে পারবেন না।

প্রকাশের জন্য সজ্ঞান সম্মতি নিন

‘সজ্ঞান সম্মতি’ একটা গভীরতর বিষয়। এটা নেহায়েৎ আপনার সূত্রকে এই প্রশ্নটি করে নেওয়া নয় যে, “আপনি যা বললেন তা যদি আমরা প্রকাশ করি, তাতে আপনার কোনো আপত্তি আছে কি না?” এর অর্থ, আপনার সূত্র তা প্রকাশের সম্ভাব্য পরিণতি ও ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি এটাও বুঝতে পেরেছেন যে, আপনার প্রদত্ত সুরক্ষাগুলো কাজে দিতে পারে (আবার নাও পারে)। তিনি এগুলো পুরোপুরিভাবে জ্ঞাত হয়েই তা প্রকাশে সম্মতি দিয়েছেন। মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবেন না। তবে সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়টিও তাঁদের কাছে লুকাবেন না। মানুষজন যতবেশি তথ্য দেবে এবং তা প্রকাশের বিষয়ে সম্মতি দেবে, আপনার প্রতিবেদন তত বেশি শক্তিশালী হবে। এ ধরনের আলাপচারিতা সূত্রের সঙ্গে আপনার সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে সহায়তা করবে এবং তাতে আরও বেশি ফলদায়ক আলাপচারিতা পাবেন। যদি কিছু পরিচয় গোপনও করতে হয়, তারপরও এটা কাজে দেবে।

সহমর্মিতা নয়, সহানুভূতি

“ওহ, কতটা ভয়ংকর। আপনার এমন খারাপ অবস্থা”। এমন কথা কখনো বলবেন না। এ ধরনের কথা আপনার সূত্রের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাবে। তিনি হয়তো তখন দূর্বল ও অসহায় বোধ করবেন। সাক্ষাৎকারদাতাকে তার কাহিনীটা বলার জন্য একটা নিরাপদ জায়গা করে দিন। যেটা দরকার সেটা হচ্ছে, একটা নিরপেক্ষ, খোলাখুলি শোনার ধরণ ও যথেষ্ট সময়, যাতে করে সেই ব্যক্তি চিন্তা করার সময় পায় এবং নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নিয়মিতভাবে উৎসাহমূলক সাড়া দিন। সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলুন, “ঠিক আছে, বলুন…”, অথবা “আমাকে আরও কিছু বলুন”। সংস্কৃতিগতভাবে যদি উপযুক্ত হয় তাহলে, সেই ব্যক্তির বাহু মৃদু চাপড়ে দিয়ে আশ্বস্ত করতে কোনো দোষ নেই। এককথায়, আপনার মানবিক প্রবৃত্তি অনুসারে আপনি চলবেন।

লেখা থামান

আপনার সূত্র হয়তো একনিবিষ্ট মনে কথা বলছেন। এর ভেতরেই আপনি নোট নিয়ে চলেছেন। এটা মাঝেমধ্যে সূত্রের কাছে খারাপ লাগতে পারে। প্রশ্নমালা যদি সংবেদনশীল জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়, তাহলে কেবলই শুনতে থাকুন। আপনি পরেও নোট লিখতে পারবেন।

শ্রদ্ধা দেখান

তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করে যাবেন না। সূত্রের কোনো উত্তরকে উত্তেজনার্পূণ করে তোলার মাধ্যমে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। সব সময় আপনি সূত্রের আয়নায় নিজেকে দেখবেন। এটা নিশ্চিত করুন যে আপনার প্রশ্নগুলো অসংবেদনশীল নয়।

কঠোর হোন

আপনি সংবেদনশীলতা মাথায় অবশ্যই রাখবেন। কিন্তু এরপরও আপনাকে কঠিন কঠিন সব প্রশ্ন করতে হবে। কেউ হয়তো আপনাকে বলবেন যে তিনি নির্যাতনের শিকার। এর অর্থ এই নয় যে সেটা অবশ্যই সত্য। যেসব মানুষ ঘটনা অতিরঞ্জিত করতে পারেন, তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। এটা স্পষ্ট করে বলুন যে তাঁদের ঘটনাটা সত্য, এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দূর্ভোগ বা ভোগান্তির বিষয়ে কিছু করা যাবে না। অন্যান্য সাক্ষাৎকারের বেলায় আপনি যেমন কয়েকটি মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে নেন, এমন ক্ষেত্রেও তা করার ক্ষেত্রে অবহেলা করবেন না।


সঠিক প্রশ্নটি করা না করার ওপরে প্রতিবেদন হবে কি হবে না তা নির্ভর করে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে: আপনি কিভাবে সেই গল্পটি পাঠকের সামনে সহজবোধ্য আকারে হাজির করতে পারছেন। একটা আকর্ষনীয় সংবাদ প্রতিবেদন লেখার জন্য আপনি সংগৃহীত তথ্য কীভাবে বাছাই করবেন, তা নিয়ে আলোচনা থাকবে পরের অধ্যায়ে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে বাসা থেকে কলেজছাত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

সিলেট থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু ?

উত্তরাঞ্চল সফর হলো না, তারেক রহমানের নির্বাচনী সফর সিলেট থেকেই শুরু?

ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি কে?

জকসু নির্বাচন : কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬৫ শতাংশ

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ প্রশ্ন করুন

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে পাবেন ভেতরের খবর

গবেষণা, গবেষণা, গবেষণা

তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষার কৌশল

১০

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?

১১

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের খবরের সন্ধান

১২

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে হবেন

১৩

জমে উঠেছে জকসু নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর হিড়িক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা

১৪

বিজ্ঞপ্তির ১ ঘণ্টা পরও ফল দেখতে পারছেন না জবির ভর্তিচ্ছুরা, ডিন বললেন- ‘ভুলে হয়েছে’

১৫

প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রিপোর্টে হাতে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

১৬

বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন

১৭

আপিলের প্রথম দিনে যে ৪২ আসনের আবেদন জমা পড়ল

১৮

চাঁদাবাজির মামলায় জামিন মুক্তি পেয়েছেন ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী

১৯

সারাদেশে শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর অভিযান

২০