রবিবার , ১১ জানুয়ারী ২০২৬
studentnewsbd
৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১:২৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গবেষণা, গবেষণা, গবেষণা

গবেষণা,গবেষণা, গবেষণা

কাজ শুরুর জন্য একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কিছু প্রাথমিক গবেষণা দক্ষতা থাকতে হয়। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সাজানো, নথিপত্রের সূত্র ধরে খোঁজাখুজি, এবং কম্পিউটার নির্ভর রিপোর্টিং – এমন নানা ধরণের কৌশল ও টুলের ব্যবহার সম্পর্কেও তাদের জানতে হয়। এই অধ্যায়ে মূলত এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। সংখ্যার হিসাব-নিকাশ করার মৌলিক দক্ষতাও এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য জরুরি হয়ে গেছে। কারণ কিছু প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে পরিমাণগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে।

তথ্য কীভাবে পাবেন?


অনেক দেশেই দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন, সন্ত্রাসদমন আইন কিংবা স্রেফ সরকারি কর্মকর্তাদের অনীহার কারণে সরকারি বা বেসরকারি খাতের নানা তথ্য জনগণের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে যায়। সরকার কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভর্তূকি দিচ্ছে, এনিয়ে স্বচ্ছতার দাবি জোরালো হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে ইউরোপের কয়েকটি দেশ তথ্য প্রকাশের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে। তাও এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল সাত বছর। ভর্তুকির টাকা কোন ব্যবসায় যাচ্ছে সেই তথ্য প্রকাশ করতেও, ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল, অর্থ্যাৎ সাত বছর সময় নিয়েছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। এই তথ্য পেতে সেখানকার ছয়টি দেশের সাংবাদিকরা জোটবদ্ধ হয়ে আদালতে মামলা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারী ভর্তুকির গন্তব্য ইউরোপের জনগণকে জানানো। এই আইনি লড়াইয়ের ফলাফলটাও ছিল মহামূল্য: সরকারগুলো তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয় এবং সেখানে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় সেসব ভর্তূকি মূলত গিয়েছে বড় বড় শিল্পপতি আর রাজপরিবারগুলোর কয়েকজন সদস্যের পকেটে। কোটি কোটি পাউন্ড আর ইউরো ভর্তুকি দিয়ে তাঁদের এমনিতেই লাভজনক ব্যবসাকে আরো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র বা টিকে থাকার সংগ্রামে মরিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন কিছুই পায়নি।

আপনি যদি এমন কোনো দেশে থাকেন যেখানে তথ্য অধিকার আইন নেই, উল্টো পদে পদে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইনের বাধা আছে, তাহলে আপনাকে অনেক লড়াই করতে হবে। হয়তো সরকারি কর্মকর্তারা আপনাকে কোনো নথি দিতে দেরি করতে পারে। বা অবস্থা আরো খারাপ হলে, আপনাকে টাকা দিয়ে সেটি নিতে হতে পারে। টাকা ছাড়া নথি পাওয়ার আর কোনো উপায় না থাকলে আপনি কী-ইবা করতে পারেন? দীর্ঘ, কঠিন পথটা হলো তথ্য অধিকার আইনের জন্য লড়াই করা এবং সেটি ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া। আপনার দেশে যদি তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার (রাইট টু ইনফরমেশন, আরটিআই) আইন থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত সাধারণ ধাপগুলো অনুসরণ করে তথ্য পেতে পারেন:

  • > বিষয়বস্তুর ওপর আধা সরকারি বা বিশেষ কিছু প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করুন এবং এমন কাউকে খুঁজে বের করুন, যিনি সংশ্লিsষ্ট নথি পেতে বা দেখতে আপনার সহায়তা করবেন।
  • > সবসময় যাচাই করে নিন, তথ্যটি কি এরই মধ্যে প্রকাশ হয়ে গেছে কি না। সীমিত আকারে বা সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রকাশিত সংবাদপত্রেও মাঝেমধ্যে গোপন নথিপত্রের সারাংশ বা হুবহু অংশ ছাপা হয়।
  • > সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করুন। আপনি যদি দেখাতে পারেন যে সব ধরনের বিকল্প আপনি চেষ্টা করেছেন, তাহলে নথি পেতে আপনার দাবি আরও জোরদার হবে।
  • > আগেভাগে পরিকল্পনা করুন: আরটিআই প্রক্রিয়াটি ধীর হতে পারে, এবং এই আইনের আশ্রয় নেওয়ার মানে এটা নয় যে আপনি আগামীকালই নথি পেয়ে যাবেন। কাজেই সঠিক তথ্য কার কাছে রয়েছে, তাঁকে চিহ্নিত করুন এবং তাঁর কাছে যান।
  • > যথাযথ নথি পেতে বিষয়ের নাম বা সংখ্যাগত পরিচিতি উল্লেখ করে অনুরোধ করুন। ‘যা আছে সব দিন’- এই ধরনের আবেদন করলে অগ্রাহ্য বা দেরি করার অজুহাত পেয়ে যান কর্মকর্তারাও।
  • > আপনার অনুরোধ এবং যে জবাব পেয়েছেন, তা খুব যতেœর সঙ্গে নথিবদ্ধ করুন। সেগুলো আপনার কাজে লাগতে পারে এটি প্রমাণের জন্য যে, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘন করছে এবং হয়তো কিছু গোপন করতে চাইছে।

নিজের ডেটাবেস কীভাবে গড়ে তুলবেন?


অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সবসময় বুঝতে চায় সিস্টেম বা ব্যাবস্থা কিভাবে কাজ করে, অথবা কিভাবে তার কাজ করার কথা। এজন্য আপনার যে ধরনের তথ্য দরকার, তা বিবেচনায় নিন। আপনার প্রশ্নগুলোকে এভাবে সাজান:

  • এই প্রক্রিয়া বা সিস্টেম কীভাবে কাজ করার কথা?
  • কার কখন এবং কীভাবে কাজ করার কথা ছিল?
  • প্রক্রিয়াটি কীভাবে নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে?
  • প্রক্রিয়ায় কী ধরনের মানদন্ড থাকতে হবে, কীভাবে তা নিশ্চিত করা হবে এবং কে নিশ্চিত করবেন?

জবাবগুলো যতটা বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ হবে, ততই আপনি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, কোথায় এবং কখন গলদ হচ্ছে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার পাশাপাশি, আপনার অনুসন্ধানে আরো কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। এটি মাথায় রেখে কাজ করলে আপনার তথ্য, ফাইলপত্র খুব ভালোভাবে গুছিয়ে রাখা সহজ হবে। যেন প্রতিবেদন লেখার সময় সবকিছু খুঁজে পেতে আপনার সময় বেশি না লাগে, বা কিছু ভুলে যাওয়ার মতো অবস্থা না হয়।

হাতে থাকা কেসের জন্য টাইমলাইন তৈরি

অনুসন্ধানের ধাপগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে এই নয় যে আপনাকে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে হবে। বরং, কখন, কোন তথ্যটি পাওয়া গেল তার ধারাবাহিক কালক্রম বজায় রাখতে হবে। তাহলে, আপনি কোনটির পর কী হয়েছে এবং যুগপৎভাবে কী হয়েছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরতে পারবেন।

আপনাকে জ্ঞানের গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্যও করতে হবে।

পরিমাণগত দিকটা হলো বিভিন্ন সংখ্যাগত হিসাব। ধরা যাক, একটি ওষুধের ক্ষেত্রে কতগুলো গুণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিত? জলাশয়ে দূষণের মাত্রা কত? বিগত পাঁচ বছরে শহরে অপরাধের হার কী পরিমাণে বেড়েছে? প্রায়শই সংখ্যার হিসাবে অকাট্য প্রমাণ থাকার কারণে স্থানীয় একটি সংবাদ জাতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। যেমন আপনার এলাকায় বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার হয়তো পুরো দেশেরই চিত্র প্রতিফলিত করতে পারে।

বিশ্বের বহু জায়গায়ই পরিমাণগত বা লিখিত নথি পাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ এমন নথি হয়তো থাকেই না। তবে নথিপত্রের ঘাটতি রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে কোনো একটি বিষয়ে অনুসন্ধানের আরও দুটি উপায় রয়েছে: নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর পরিকল্পিত সাক্ষাৎকার। সাধারণ মানুষ, ঘটনা, যুক্তি, উদ্দেশ্য, অনুভূতি, ও তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদিকে বিবেচনা করা হয় কোয়ালিটেটিভ ডেটা হিসেবে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো একটি বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে তা আপনাকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। যেমন ছোটো একটি জমির দলিল বা ঠিকানা আপনাকে ওই জমির মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

গবেষণাকে গুছিয়ে রাখা

অনুসন্ধানলব্ধ সব তথ্য সুসংগঠিত করতে কিছু ইলেকট্রনিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা টুলস রয়েছে, যা সাক্ষাৎকার, যোগাযোগের তথ্য, তথ্যদাতা ও তাঁদের দক্ষতার জায়গাগুলো নিয়ে ডেটাবেস তৈরিতে আপনার সহায়ক হবে। এতে প্রশ্নের তালিকা, ঘটনা বা তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে প্রমাণিত তথ্য ও প্রমাণের অপেক্ষায় থাকা ধারণা বা সম্ভাব্য বিষয় এবং নথি-সংশ্লিষ্ট হাইপারলিংক, পরিসংখ্যান, তথ্যভান্ডার, সারমর্ম এবং সাক্ষাৎকার সংরক্ষিত হবে। সাংবাদিকদের মধ্যে এভারনোট (Evernote) খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এটি গোপন তথ্য সংরক্ষণের জন্য ততটা নিরাপদ নয়। ব্যবস্থাপনা টুল বাছাইয়ের আগে তার নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

গোছানো সাক্ষাৎকার নেওয়া


গোছানো/কাঠামোগত সাক্ষাৎকার অনেকটা ছোটখাট জরিপের মতো। আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের অনুপস্থিতিতে এভাবেই আপনি গোছানো উপায়ে ডেটা তৈরি করে নিতে পারেন। এজন্য আপনার প্রয়োজন হবে সাধারণ কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের তালিকা। যেখান থেকে আপনি কিছু কোয়ানটিটিভ ডেটা পাবেন বলে আশা করতে পারেন। যদিও আপনাকে সবসময়ই তাৎক্ষণিকভাবে চিন্তা করতে পারতে হবে। কখনো কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সময় বাড়তি কিছু প্রশ্নও জুড়ে দিতে হতে পারে।

১. এমন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নতালিকা তৈরি করুন, যাতে সম্ভাব্য সত্য তথ্যগুলো উঠে আসবে। যেমন: সূত্রকে জিজ্ঞেস করুন, প্রথমবার কখন এরকম ঘটনা ঘটেছিল, তা তিনি মনে করতে পারেন কিনা। এই উপায়ে আপনি সমস্যাটা কখন থেকে শুরু হলো, তা জানতে পারবেন (উদাহরণস্বরূপ, ধর্ষণ বা হামলা, ফসলহানি, সড়কের ক্ষতি, গুম), এর সম্ভাব্য কারণ (যেমন তিনি বলতে পারেন যে ঘটনার সময় ‘ক‘ও সেখানে ছিলেন), এবং অন্যদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল (যেমন আমরা ‘এক্স’ শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম)।

২. সব তথ্যদাতাকে একই ধরনের প্রশ্ন করুন।

৩. প্রশ্নগুলো যথাযথভাবে করুন, সুনির্দিষ্টভাবে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করুন এবং উত্তরগুলো যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করুন। এটি এমন এক ধরনের সাক্ষাৎকার পদ্ধতি যেখানে ক্লোজ এন্ডেড – অর্থ্যাৎ, যথাযথ জবাব পেতে হ্যাঁ বা না সূচক এক শব্দেই উত্তর হয় এমন ধরণের – প্রশ্ন বেশ কাজে লাগে। যদিও আপনাকে খোলামেলা ও সুক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া পাওয়ার চেষ্টাও করতে হবে। সামষ্টিকভাবে এসব জবাব আপনার নিজস্ব তথ্যভান্ডার তৈরিতে কাজে আসবে।

 পেপার ট্রেইল


নথি অনুসরণ বা পেপার ট্রেইল থেকেও আপনার তথ্যভান্ডারে আরও তথ্য যোগ হতে পারে। হাইপোথিসিস সমর্থনের জন্য কী ধরনের নথিপত্র লাগবে এবং সেগুলো কিভাবে পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের জন্য একটি কৌশল তৈরি করতে হবে আপনাকে। এই প্রক্রিয়ায় আপনি একটি নথি দিয়ে শুরু করে, সেখান থেকে পরবর্তী প্রাসঙ্গিক নথির খোঁজ পাবেন। এরপর নথিগুলো বিশ্লেষণ করে আপনার পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তার যোগসূত্র মেলাতে হবে।

এসব প্রাথমিক নথিতে যা আপনার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয় সবকিছু চিহ্নিত করুন। উদাহরণত: এতে এমন কোনো ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত থাকতে পারে, যিনি গৃহযুদ্ধ কবলিত একটি এলাকায় কোনো খনিতে নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন (সংঘাত অর্থায়নে হীরার অবৈধ বাণিজ্যের জন্য যে এলাকাটি পরিচিত)। জীবনবৃত্তান্তে ওই ব্যক্তির চাকরিজীবনের ফাঁক-ফোকরগুলোর কথা নাও থাকতে পারে। এখানেই মৌলিক গাণিতিক দক্ষতার বিষয়টি আসে। তাঁর কর্মজীবনে বিভিন্ন জায়গায় কাজের সময়গুলো যোগ করলেই তার কর্মজীবনের পুরো সময়ের হিসাবে কোনো ফাঁক রয়েছে কি না, কোনো একটা সময়ের চাকরির কোনো রেকর্ড না থাকলে তা ধরা পড়বে। আপনি যদি কোনো কাজ বা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড যাচাই করেন, তাহলে জানতে পারবেন, কোনো ব্যক্তি হঠাৎ করেই চাকরি ছেড়ে গিয়েছিলেন কি না। এর মাধ্যমে ওই ব্যক্তির কর্মস্থলের ইতিহাস জানতে আরও নথি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। আপনি হয়তো জানতে পারবেন যে মানবসম্পদ বিভাগে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরি বা প্রতারণার অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছিল। এরপর ওই ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল কি না, তাঁকে আদালতে তোলা হয়েছিল কি না কিংবা কারাদন্ড হয়েছিল কি না সেই সব নথিরও প্রয়োজন পড়তে পারে। অন্য কথায়, এক নথি থেকে আপনার অন্য নথির প্রয়োজন পড়তে পারে এবং এর মাধ্যমে প্রমাণযোগ্য সাক্ষ্য পাওয়া যাবে।

প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক নথিগুলো আলাদা করে ফেলার পর নিজেকে অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় চরিত্রের জায়গায় বসান। চিন্তা করুন, তাঁর পক্ষে কী কী করা সম্ভব ছিল? তিনি একটির বদলে অন্য পথটি বেছে নিলে ভিন্ন কিছু হতো কি? এভাবে ভাবলে অন্ধকারে পথ হাতড়ানো থেকে রক্ষা পাবেন। তথ্যের জন্য লাইব্রেরি বা আর্কাইভের ওপর নির্ভর করা একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। এ বিষয়টি ছোট করে দেখবেন না। আপনার কাক্সিক্ষত তথ্য যদি ডিজিটাল ভার্সনে থাকে, তাহলে সেটির জন্য সার্চ করলে প্রাসঙ্গিক ফলাফল যেমন আসবে, একই পরিমাণ অপ্রাসঙ্গিক ফলাফলও আসবে। আর আপনি যদি এমন দেশে থাকেন, যেখানে উন্মুক্ত নথিগুলো প্রধানত কাগজপত্রে আছে; তাহলে আপনাকে হয়তো লাইব্রেরির তত্ত্বাবধায়কদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে এগুলো দেখার জন্য; এবং খুঁজে বের করতে হবে: কিভাবে নথিপত্রগুলো সাজানো আছে।

প্রায় ক্ষেত্রেই জন্মসনদ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো সরকারি নথির খোঁজ করাই কাজ শুরুর সেরা উপায় বলে দেখা যায়। তবে এগুলো পেতে বেশ সময় লাগে এবং সেটি খুব বেশি কাজেও আসে না; বিশেষ করে যদি তথ্যটি অনলাইনেই পাওয়া যায়। স্থানীয় পত্রিকাগুলোর অনলাইন আর্কাইভে সার্চ করে দেখুন, কোনো ব্যক্তির ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া বা তার কর্মস্থলের ওয়েবসাইটে খোঁজ করুন। দেখুন এসব জায়গা থেকে কী তথ্য পাওয়া যায়। আপনার কাছে যদি সেই ব্যক্তির সত্যিকার পুরো নাম থাকে, তাহলে হয়তো আপনি আদালতের মামলার মতো নথিপত্রেও তার নাম পেয়ে যেতে পারেন। তিনি কোন বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়েছেন এবং কোথায় কোথায় তার সংযোগ আছে ইত্যাদি বিষয়েও আপনি নানা তথ্য পেয়ে যেতে পারেন। সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও আপনি বিপুল পরিমাণ তথ্য পেয়ে যেতে পারেন, যা আপনাকে নথিপত্রের সন্ধানে তাড়িত করবে। যেমন স্থানীয় কোনো ভবনের বিস্তারিত তথ্য (ব্যাংক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি কার্যালয়ের), আইনি কোনো নোটিশ (যেমন দানপত্র, নাম পরিবর্তন, বিয়ে, অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া, বন্ধকী সম্পত্তির দখল, নিলাম, টেন্ডার, জব্দ/ পরিত্যক্ত সম্পত্তি ইত্যাদি) এবং গ্রেপ্তার ও আদালতের রায়। প্রতিটি তথ্যই আপনি যে ধাঁধাঁর সমাধান খুঁজছেন, তার ছোট ছোট জবাব হাজির করতে পারে।

সারকথা হলো, আপনি নথির সন্ধান করবেন এভাবে:

  • >   ইন্টারনেটে সার্চ, আর্কাইভে অনুসন্ধান এবং তথ্য দিতে পারেন এমন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত ছুটুন, যতক্ষণ না অনুসন্ধানের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত নথি পাওয়া যায়।
  • >   ডেটা ম্যাপিং কৌশল ব্যবহার করে তথ্যগুলোকে এমনভাবে সাজান, যাতে তথ্য বিশ্লেষণ করে ফাঁক-ফোকর, বৈপরীত্য ও অসঙ্গতিগুলো বের করা যায়।
  • >   কোন কোন নথি পেলে এসব ফাঁকের জবাব পাওয়া যাবে বা বৈপরীত্যগুলোর ব্যাখ্যা মিলবে, সেগুলোর ব্যাপারে চিন্তা এবং সে অনুযায়ী অনুসন্ধান শুরু করুন।

ডিজিটাল অনুসন্ধান


ইন্টারনেটের কল্যাণে রিপোর্টারদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি, এবং সেই তথ্যকে সাজানো, পুনরুদ্ধার ও বিশ্লেষণের সুযোগ বেড়ে গেছে নাটকীয়ভাবে। কয়েকটি সুপরিচিত সার্চ প্রোগ্রামের মধ্যে আছে ডাকডাকগো (DuckDuckGo) এবং মেটা-ক্রলার্স (meta-crawlers), যারা একই সঙ্গে চার থেকে পাঁচটি সার্চ ইঞ্জিনে অনুসন্ধান চালাতে পারে। ওয়েবে কার্যকর অনুসন্ধানের কৌশল হলো, গুরুত্বর্পূণ শব্দ (কী-ওয়ার্ড) ও বাক্যাংশ নির্বাচন। এগুলো হতে হবে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট, যাতে সার্চ-ফলাফলে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বাদ পড়ে। সেরা ফলাফলের জন্য আপনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী সার্চকে সাজিয়ে নিতে পারেন। ডাকডাকগোতে আপনি চাইলে সময়, অঞ্চল এবং ভাষা নির্বাচন অথবা নিজস্ব অনুসন্ধান কৌশল প্রয়োগ করতে পারবেন।

সার্চের ব্যাপকতা কমাতে নির্বাচিত শব্দ বা কী-ওয়ার্ড ব্যবহার একটি সহজ কৌশল। তবে প্রায় সময়ই, শুধু কিওয়ার্ড যথেষ্ট হয় না। ধরা যাক, আপনি জন স্মিথ নামে কোনো ব্যক্তির তথ্য খুঁজছেন। সার্চ ইঞ্জিনে কেবল তার নাম লিখে অনুসন্ধান করলে আপনার সামনে হাজির হবে এই দুটি শব্দ আছে এমন প্রতিটি ফলাফল। এই নাম সংশ্লিষ্ট লাখ লাখ রেকর্ড পাওয়া যাবে। অপ্রয়োজনীয় তথ্যের স্তুপে তলিয়ে যাওয়া এড়াতে কাক্সিক্ষত জন স্মিথের কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন তাঁর বসবাসের জায়গা বা তাঁর পেশা লিখে অনুসন্ধান করতে হবে। ইন্টারনেটে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আপনি যদি স্ক্রিনশট ব্যবহারের পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে তা নেওয়ার আগে খোলা ট্যাবগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা সবসময়ই মনে রাখতে হবে। সেখান থেকে স্পর্শকাতর তথ্য অপসারণ করতে হবে, না হলে আপনার স্ক্রিনশটে ওইসব তথ্যগুলোও প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।

কাঠামোবদ্ধ এবং সহজে অনুসন্ধান করা যায়, এমন কৌশলে নিজের তথ্যভান্ডার তৈরি করা ভালো। যখন আপনি ইন্টারনেট থেকে নথি নিয়ে সংরক্ষণ করবেন কিংবা সাক্ষাৎকার বা কোনো নোট সংরক্ষণ করবেন, এগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যেন পরে তা আবার সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে কিছু প্রকল্প ব্যবস্থাপনা টুল ব্যবহার করা যেতে পারে।

সবশেষে বিবেচনায় রাখতে হবে এই নৈতিক বিষয়গুলো:

  • !   যদি সম্ভব হয়, বিস্তারিত তথ্যসূত্র বা মূল ওয়েবসাইটের লিংক প্রকাশ করুন; অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা বজায় রাখুন।
  • !   সাবধানতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করুন, বিশেষ করে তথ্যটির তারিখ।
  • !   পরিসংখ্যাণগত ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যের ব্যাপারে সঠিক উপসংহারে পৌঁছান; আপনার পাঠক হয়তো গণনার কাজটি করতে পারবে না এবং আপনার অংকের ওপরই তাদের ভরসা করতে হবে।

অনুসন্ধান ও গবেষণার কিছু কৌশল পাওয়া যাবে এখানে: http://researchclinic.net বা এখানে: https://www.youtube.com/watch?v=R0DQfwc72PM

ডেটা সংগ্রহ


সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজিরের জন্য ডেটা সংগ্রহই সম্ভবত সবচে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়া। কোন সূত্র অনুসরণ করলে আপনি সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন, সেটা আপনাকে ভেবে দেখতে হবে: যেমন, একটি হাসপাতালে নার্সদের চুরির ব্যাপারে হাসপাতালে ভর্তি কোনো একজন রোগীর অভিযোগ, নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের শুনানি ও বরখাস্ত হওয়ার রেকর্ড সংবলিত ডেটাবেস? আপনাকে মাথায় রাখতে হবে – সব তথ্যের মতো পরিসংখ্যানেও কারচুপি বা বিকৃতি থাকতে পারে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হতে পারে। তবে ডেটাবেসের তথ্য কার্যকরভাবে সংগ্রহ করার মাধ্যমে গত দশকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর বেরিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ডেটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ফলাফল দিতে পারে। যেমন উন্নয়ন সহযোগী দাতারা প্রতিবছরই তাদের খরচ করা অর্থের বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দাতাদের ভান্ডার থেকে আপনার দেশের জন্য প্রযোজ্য ডেটা সংগ্রহ করে নিয়ে, সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পারেন। এখান থেকে ‘সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণেই বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় করেছে দাতারা’-এমন শিরোনামের প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন।

ডেটা মাইনিং যে সবসময় কেবল আর্থিক বিষয়াদি নিয়েই হতে হবে, এমন নয়। সামাজিক নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক দলের সমর্থক, এবং বিশেষ কোনো সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিবেদনও তৈরি হয়েছে। এসব নেটওয়ার্ক হতে পারে কোনো সুনির্দিষ্ট পেশার, ভৌগলিক গোষ্ঠীর সদস্যদের অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের বিশিষ্ট নেতাদের। তাঁদের আয়, তাঁরা কাদের সঙ্গে কাজ ও সাক্ষাৎ করেন, সেসবের তথ্য একত্র করতে পারেন আপনি, যা একটি সামাজিক নেটওয়ার্কের চিত্র তুলে ধরে, যা সমাজে তাঁদের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দেবে।

সবসময়ই যে আপনাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে, এমনও না। সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংগঠন অনেক সময় নানা ডেটাবেজ তৈরি ও প্রকাশ করে। এগুলিকেও আপনি আপনার গবেষণার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এসব ডেটাবেসে প্রবন্ধ, গবেষণা এবং যোগাযোগের তথ্যও থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেন্দ্রগুলোও বিভিন্ন ডেটাবেস তৈরি করেছে সবার ব্যবহারের জন্য। ঘরের আরো কাছে, সিঙ্গাপুরের সরকার তার কিছু ডেটা অনলাইনে তুলে দিয়েছে সবার দেখার জন্য।

যেমন, গুয়ান্তানামো বে কারাগারের বন্দীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সেই ডেটাবেজ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Nicar। সেগুলো পাওয়া যাবে এখানে: www.ire.org/nicar

সংখ্যা নিয়ে করণীয়


বেশির ভাগ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গুণগত হয়। কেন ও কীভাবে অনিয়ম হয়েছে এবং কারা দায়ী হতে পারে, তার খোঁজ পাওয়া যায় এ ধরণের প্রতিবেদনে। তবে, তাতে সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যও থাকে। যেমন: ঘাটতি কত বড়? আপনার দেশে অবৈধ মাছ শিকারের পরিসংখ্যান কী? স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর কতজন রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়?

এর অর্থ, ছোট থেকে বড় সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়, তা আপনাকে জানতে হবে। সেই সঙ্গে জানতে হবে খুব সাধারণ কিছু গণনার মাধ্যমে শতকরা হারে সংখ্যার উপস্থাপনকে কীভাবে গুরুত্ববহ করে তুলতে হয়। সংখ্যাকে ভালোবাসার কারণেই যে বেশির ভাগ মানুষ সাংবাদিক হন, তা নয়। তবে সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য জটিল কিছু নয়। বাস্তবতা হলো, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এটি জরুরি।

আপনি মৌলিক তথ্য বোঝার মাধ্যমে কাজটা শুরু করবেন। যেমন, আপনি যদি কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নার্সের দাপ্তরিক কাজের বিবরণ ও কর্মদক্ষতা যাচাই করতে চান, তাহলে একজন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে পারেন। তিনি আপনাকে এই পেশার কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের একটি কালক্রম তৈরি করে দিতে পারবেন। এরপর পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আপনি আরো যা যা খুঁজে পেতে পারেন:

  • কোন কাজে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়? নার্সরা কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে বিকল্প কিছু করেন কি না? সেই বিকল্পগুলো কি? নার্সদের ওপর কি কর্মঘণ্টার মধ্যে অনেক বেশি দায়িত্ব পালনের চাপ সামলাতে হয়?
  • কতজন রোগীকে সেবা দিতে হবে, তার সঙ্গে একজন নার্সের কাজের বিবরণের সম্পর্ক কীভাবে নিরূপন করা হয়? একজন রোগীকে সেবা দিতে কত সময় লাগে?

একইভাবে, আপনার যদি বাতাসের নমুনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়, তাহলে বাতাসে দূষণ সৃষ্টিকারী কী কী উপাদান রয়েছে, তা জেনে নিয়ে আপনি একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন, এসব উপাদান বিপজ্জনক কি না এবং বাতাসে এগুলোর মাত্রা কত হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিজের দেশের নিরাপদ বায়ু বিষয়ক আইন-কানুন ও নীতিমালার সঙ্গে বাতাসে থাকা উপাদানের মাত্রা তুলনা করুন। আপনি হয়তো তখন জানতে পারবেন, এ সমস্যা শুরু হয়েছে অনেক আগে এবং এরপর পরিস্থিতি খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অথবা জানতে পারেন, এ ধরনের দূষণজনিত সমস্যা প্রায়শ ঘটছে অথবা বাতাসে এগুলোর মাত্রা আগে যতটা থাকতো, এখন তার চেয়ে কম। সাংবাদিকের কাজ হলো এসব সংখ্যার ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ঠিক কখন থেকে এ সমস্যা বড় হয়ে উঠলো বা সবার নজরে এল, তা তুলে ধরা। তবে সংখ্যাই সব কথা নয়। এখন কেন এ সমস্যা লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠল- সে পটভূমিটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং হয়তো সেটাই আপনার প্রতিবেদনের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

বেশির ভাগ দেশে আবহাওয়া পরিসংখ্যান হলো সবচেয়ে বড় সংখ্যাগত রেকর্ডের অন্যতম। যেমন, আফ্রিকায় উপনিবেশিক যুগে কর্তৃপক্ষ তথ্যের প্রথম যে সংগ্রহ গড়ে তুলেছিল, তার মধ্যে আবহাওয়ার পরিসংখ্যান একটি। এমনকি সমাজে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ইতিহাস থেকে ওই সময়েরও আগে বন্যা ও খরার তথ্য পাওয়া যায়। এশিয়ার অনেক দেশেই আবহাওয়ার তথ্য সংবলিত ডেটাবেস রয়েছে, যেখানে আবহাওয়ার ধরন বিষয়ক নথি পাওয়া যাবে। আপনি হয়তো আপনার দেশে ঘটে চলা জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও খরা আসলেই অভূতপূর্ব কি না, তা জানতে অনুসন্ধান করতে চাইবেন। এ ক্ষেত্রে আপনি আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রবণতা বিষয়ক তথ্যগুলো তুলনা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন।

এটি আমাদের নিয়ে যায় আরেকটি জায়গায়: ডেটা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আর এখান থকে আপনি নতুন নতুন ধারণা পেতে পারেন। যেমন, প্রেস রিলিজে থাকা পরিসংখ্যান কেউ খুব একটা যাচাই করে না। যারা সেটি লিখছেন, তারাও আশা করেন না কেউ প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রায়ই আলোড়ন সৃষ্টিকারী সব প্রতিবেদনের জন্ম দেয়। ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা কোনো সম্ভাব্য খবরের সূত্রই হাতছাড়া করেন না। একইসঙ্গে সংখ্যা, রেখাচিত্র এবং/অথবা সংখ্যাতাত্ত্বিক অন্যান্য তথ্যের ক্ষেত্রে সন্দেহপ্রবণ হওয়া উচিত। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এই ডেটাগুলো দিয়ে দারুন একটি মৌলিক প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে। কিন্তু ভালো অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এসব পরিসংখ্যানের উৎস ভালোভাবে জানার চেষ্টা করা উচিৎ। যেমন, জরিপটা কীভাবে চালানো হলো, নমুনাগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হলো, কে অর্থায়ন করেছে, কে প্রকাশ করেছে, কিংবা সেটি প্রকাশকারীরা নিজেদের স্বার্থে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিয়েছে কি না?

প্রেক্ষাপট খুবই গুরুত্বপূর্ণ: শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে কোনো অর্থ তৈরি হয় না। সাংবাদিক হিসেবে, ব্যাখ্যা ও প্রশ্ন করার মাধ্যমে আপনি সেখানে অর্থ যোগ করেন।

নমুনা ও তুলনা


শুধু সংখ্যা আপনাকে খুব সামান্যই তথ্য দেয়। পুরো জনগোষ্ঠীর যে অংশের মধ্য থেকে তথ্য তুলে আনা হয়েছে সেটির নানারকম অর্থ হতে পারে। ‘পাঁচজন চিকিৎসকের মধ্যে চারজন’ শুনতে হয়তো ভালোই লাগবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের কয়েক হাজার চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ২০ জনের মধ্য থেকে তুলে আনা এই ফলাফলে যে ১৬ জন চিকিৎসককে ভিন্নভাবে চিত্রিত করা হলো তা মোটেও প্রতিনিধিত্বশীল নয়। পুরো দেশের সব চিকিৎসক কী চিন্তা করছেন বা কেমন আচরণ করেন, তা এই তথ্যে উপস্থাপিত হয় না।

একটি প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপের আরও অনেক নির্ণায়ক থাকে। চিকিৎসকের উদাহরণের ক্ষেত্রে বলা যায়, সাংবাদিকদের দেখা উচিৎ:

      • দেশজুড়ে বিভিন্ন জনের মতামত পেতে বিভিন্ন শহরে বা হাসপাতালে এই জরিপ চালানো হয়েছে কি না
      • জরিপ চালাতে কোন উপায় ব্যবহার করা হয়েছে- টেলিফোন, অনলাইন নাকি মুখোমুখি সাক্ষাৎকার?
      • নির্বাচিত জরিপ পদ্ধতিটি কিভাবে অংশগ্রহণকারীদের উত্তর প্রভাবিত করেছে?
      • সব লিঙ্গেও, সব বয়সের চিকিৎসকের মতামত কি এতে উঠে এসেছে?

এগুলো কিছু উদাহরণ মাত্র। জরিপের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করার সময় সাংবাদিকরা কোন মানদণ্ড বিবেচনা করবেন, তা নির্ধারিত হবে জরিপের বিষয় ও ফলাফলের ভিত্তিতে।

রেখাচিত্র


চিত্র ও রেখাচিত্র ব্যাখ্যায় সবসময়ই শীর্ষ বা চূড়ার দিকে তাকান। রেখাচিত্রের ক্ষেত্রে আপনাকে মাত্রা আর শুরুর জায়গাটা বুঝতে হবে। পরিবর্তন যে অংশে দৃশ্যমান শুধু সেই অংশটিতেই আলোকপাত করার মাধ্যমে পরিমাপকের মাত্রা বাড়িয়ে তাকে নাটকীয়ভাবে তুলে ধরা যায়। রেখাচিত্র বিশ্লেষণের সময় শতকরা হিসাবের ব্যাপারে ভালো করে যাচাই করতে হবে। আগের নমুনা ও তুলনার তথ্যেও কথা মাথায় রাখতে হবে।

কখনো কখনো পরিসংখ্যানের দুটি গুচ্ছ বা সেট একই ধরনের প্রবণতা তুলে ধরে। এর মানে এই নয় যে তারা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা দুটির মধ্যে কারণ ও প্রভাব সংশ্লিষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা বড় হয়। একই হারে বাড়ে তাদের ভাষার দক্ষতাও। তার মানে এই নয় যে শারীরিক বৃদ্ধিই তাদের ভাষার দক্ষতা বাড়ায়! আবারও বলছি, আপনাকে রেখাচিত্র ও চার্ট ভালোভাবে পর্যালোচনা করে বোঝাতে হবে কেন এগুলোর মধ্যে যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। এধরণের সম্পর্ক প্রমাণে এ বিষয়ে কি একই ধরনের গ্রহণযোগ্য গবেষণা আছে? একইভাবে একটির পর আরেকটি ঘটনা ঘটা মানেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ হয়ে যাওয়া নয় যে, প্রথম ঘটনার কারণেই দ্বিতীয়টি ঘটেছে। কেবল পরিসংখ্যান দিয়েই কোনো কিছু প্রমাণ সম্ভব নয়। এর সাথে প্রাসঙ্গিক পটভূমির বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রয়োজন। এতে অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলোকে বাদ দিতে দিতে, আপনি সেই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিটি সনাক্ত করতে পারবেন, যার কারণে প্রথম ঘটনাটির পর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে।

ডেটার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানের সময়, খোঁজ করুন: কোন প্রতিষ্ঠান এই জরিপটি করিয়েছে এবং এখানে তাদের কোনো নির্দিষ্ট স্বার্থ জড়িত আছে কিনা। ই-সিগারেটের ওপর পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বার্তাসংস্থা রয়টার্স। পরীক্ষাটি চালিয়েছিল ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল। কোম্পানিটি এমন একটি সিগারেট তৈরি করতে চেয়েছিল, যা কফির চেয়েও কম ক্ষতিকর। রয়টার্সের এই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়: কিভাবে এরকম একটি গবেষণার ফলাফল ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের করা জরিপ-গবেষণা নিয়েও সংশয়ী হতে হবে। কারণ কোনো কোনো বিভাগ এসব গবেষণার জন্য অনুদানের ওপর নির্ভর করে এবং সেই অনুদানের পেছনে কারো স্বার্থ জড়িয়ে থাকতে পারে।


এতক্ষণে আপনি সব ধরনের তথ্য যোগাড় করে ফেলেছেন, সম্ভাব্য সূত্র বা তথ্যদাতাদের নাম জেনেছেন, এবং একটি ডেটাবেসও তৈরি করেছেন। পরের অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে ভালো ব্যক্তি-সূত্র চিহ্নিত করা, এবং তাদের কাছ থেকে তথ্য বের করার কৌশল।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে বাসা থেকে কলেজছাত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

সিলেট থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু ?

উত্তরাঞ্চল সফর হলো না, তারেক রহমানের নির্বাচনী সফর সিলেট থেকেই শুরু?

ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি কে?

জকসু নির্বাচন : কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬৫ শতাংশ

চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি লেখা গোছানো এবং ভালো না হয়

সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যথাযথ প্রশ্ন করুন

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে পাবেন ভেতরের খবর

গবেষণা, গবেষণা, গবেষণা

তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষার কৌশল

১০

কীভাবে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করবেন?

১১

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের খবরের সন্ধান

১২

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যেভাবে হবেন

১৩

জমে উঠেছে জকসু নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর হিড়িক, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা

১৪

বিজ্ঞপ্তির ১ ঘণ্টা পরও ফল দেখতে পারছেন না জবির ভর্তিচ্ছুরা, ডিন বললেন- ‘ভুলে হয়েছে’

১৫

প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রিপোর্টে হাতে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

১৬

বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন

১৭

আপিলের প্রথম দিনে যে ৪২ আসনের আবেদন জমা পড়ল

১৮

চাঁদাবাজির মামলায় জামিন মুক্তি পেয়েছেন ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী

১৯

সারাদেশে শুরু হচ্ছে যৌথবাহিনীর অভিযান

২০